দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে এক ভয়াবহ ও অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে গেছে। এই অস্বাভাবিক গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজকর্ম, কৃষি উৎপাদন ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষার আগে তাপপ্রবাহ নতুন কিছু নয়। তবে এবারের তাপপ্রবাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং বিস্তার অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বিষয়টি এখন একটি আঞ্চলিক জলবায়ু সংকটে রূপ নিচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো উচ্চচাপ বলয়। এটি গরম বাতাসকে ভূমির কাছাকাছি আটকে রাখে, ফলে বাতাস ওপরে উঠে ঠান্ডা হতে পারে না। বরং উল্টো আরও উত্তপ্ত হয়ে নিচের দিকেই থেকে যায়। এর পাশাপাশি দুর্বল বর্ষা-পূর্ব বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
এছাড়া এল নিনো প্রভাবও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, এল নিনো পরিস্থিতি চলমান থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বাড়তে পারে। যদিও এল নিনো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন তৈরি করে না, তবে এটি বিদ্যমান উষ্ণতার মাত্রাকে অনেক বেশি তীব্র করে তোলে।
ভারতে ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় ৪৬ থেকে ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। পাকিস্তানের করাচিতেও তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছে। বাংলাদেশেও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নিয়মিতভাবে রেকর্ড হচ্ছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি।
এই তাপপ্রবাহের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ। যারা দিনের অধিকাংশ সময় বাইরে কাজ করেন, তারা সরাসরি তাপের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এতে শুধু আয় কমছে না, বরং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। হিটস্ট্রোক, কিডনি সমস্যা, হৃদরোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে থাকার ফলে শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
সরকারগুলো কিছু হিট অ্যাকশন প্ল্যান চালু করলেও সেগুলো মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং সীমিত পরিসরে কার্যকর। গ্রামীণ ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন গবেষকরা। তাদের মতে, আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এই অঞ্চল বসবাসের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
তবে আশার বিষয় হলো, সঠিক পরিকল্পনা, নগর ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, গাছপালা বৃদ্ধি, তাপসহনশীল অবকাঠামো এবং কার্যকর জনসচেতনতা তৈরি করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
কসমিক ডেস্ক