গুম ও হত্যা মামলায় অভিযোগ থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে পদায়ন করা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে এই পদে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান বর্তমানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকাকালে তিনি একাধিক গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করছে। একইসঙ্গে তার বিরুদ্ধে গুম কমিশনে অভিযোগও দাখিল করা হয়েছে।
এক যুবদল নেতার হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক ঘটনায় তার নাম আসামি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবদল নেতা মিজানের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তিনি ১০ নম্বর আসামি। ওই ঘটনায় নিহতের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ওই সময় তাদের পরিবারের একাধিক সদস্যকে আটক ও নিখোঁজ করা হয়। এছাড়া পুলিশের পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘদিন তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আরও দাবি করেন, পরে অর্থের বিনিময়ে মুক্তি বা তথ্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে আরও জোরালো করে।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর ভুক্তভোগী পরিবার আবারও সংবাদ সম্মেলন করে নিখোঁজ সদস্যদের সন্ধান এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানায়। একইসঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং গুম কমিশনেও অভিযোগ দাখিল করে।
এদিকে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ফেনীর পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়ন করা হয়। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরই ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে পদায়ন বাতিলের দাবি ওঠে। তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত আবেদন জমা দিয়ে অভিযোগ করেন, একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় পদায়ন করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
অন্যদিকে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, মামলাগুলোর একটিতে ইতোমধ্যে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং অন্যটিতে ঘটনার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না বলে প্রমাণ রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তদন্ত শেষে তিনি পূর্ণ অব্যাহতি পাবেন।
পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই ঘটনা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদায়ন প্রক্রিয়া, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে ফেনীর নতুন এসপি পদায়ন এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক