পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন এক অদ্ভুত ও বিতর্কিত দাবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান নাকি ভবিষ্যতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ‘কামিকাজে ডলফিন’ ব্যবহার করতে পারে। এই দাবি প্রকাশের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, যেখানে দাবি করা হয় যে মাইন বহন ও আক্রমণাত্মক কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত ডলফিনকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার সম্ভাবনা নিয়ে ইরান চিন্তাভাবনা করছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ ও প্রশ্নই বেশি তৈরি হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের এমন কোনো ডলফিন বাহিনী থাকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামুদ্রিক প্রাণীভিত্তিক সামরিক কর্মসূচি নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান, যা বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক প্রাণীদের সামরিক কাজে ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ইতিহাস বলছে, ১৯৫৯ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ডলফিন ও সমুদ্র সিংহকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এসব প্রাণী মূলত পানির নিচে মাইন শনাক্তকরণ ও উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত হয়। তাদের প্রাকৃতিক সোনার সিস্টেম অত্যন্ত উন্নত হওয়ায় এটি আধুনিক প্রযুক্তির জন্যও একটি বড় অনুপ্রেরণা।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের ডলফিন ইউনিট কোনোভাবেই আক্রমণাত্মক বা আত্মঘাতী মিশনে ব্যবহার করা হয় না। বরং এটি শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক কাজে নিয়োজিত। সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালীতে কোনো ডলফিন ব্যবহারের প্রমাণ নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক ড্রোন ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর নির্ভর করছে।
অন্যদিকে, ইরানের ডলফিন সক্ষমতা নিয়েও ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। অতীতে ২০০০ সালের দিকে রাশিয়া থেকে কিছু ডলফিন সংগ্রহের খবর পাওয়া গেলেও তাদের বর্তমান অবস্থা বা কোনো সক্রিয় সামরিক ব্যবহারের প্রমাণ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সেই ডলফিনগুলো থাকেও, তবে তাদের সামরিক অভিযানে ব্যবহার করার মতো বাস্তব সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত অনিশ্চিত।
এদিকে ‘কামিকাজে ডলফিন’ শব্দটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এটিকে অতিরঞ্জিত প্রচারণা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে তথ্যযুদ্ধের একটি নতুন দিক বলেও মনে করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত নৌপথ হওয়ায় এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এমন অস্বাভাবিক দাবিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ‘কামিকাজে ডলফিন’ বিষয়টি এখনো প্রমাণহীন একটি দাবি হলেও এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামুদ্রিক প্রাণীর সামরিক ব্যবহার নিয়ে পুরোনো ইতিহাস থাকলেও আধুনিক যুগে এ ধরনের কৌশল বাস্তবে কতটা সম্ভব—তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক