মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আবারও তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের সাতটি দ্রুতগতির নৌযান ধ্বংস করেছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ধ্বংস করা নৌযানগুলো ওই এলাকায় ইরানের হাতে থাকা শেষ কার্যকর সামুদ্রিক সম্পদের অংশ ছিল।
মার্কিন বাহিনী এই অভিযানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করেছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে এই দাবি ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ট্রাম্পের এই বক্তব্য সরাসরি অস্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, ইরানি স্পিডবোটে এমন কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। বরং এই দাবিকে তারা “ভিত্তিহীন” বলে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরানের দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এই উত্তেজনার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, তাদের জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে হামলার মুখে পড়েছে। আমিরাতের দাবি অনুযায়ী, ইরানের হামলার পর ফুজাইরাহ বন্দরে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি মার্স্ক জানিয়েছে, মার্কিন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ উদ্যোগের আওতায় তাদের একটি জাহাজ নিরাপদে প্রণালি পার হয়েছে। ‘অ্যালায়েন্স ফেয়ারফ্যাক্স’ নামের জাহাজটি ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে পারস্য উপসাগরে আটকে ছিল এবং পরে মার্কিন সামরিক সুরক্ষায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, জাহাজটির সব নাবিক নিরাপদ ও অক্ষত রয়েছেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, চলমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সংকটের সামরিক সমাধান সম্ভব নয়। তিনি মার্কিন উদ্যোগের সমালোচনা করে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’কে ‘প্রজেক্ট ডেডলক’ বলে মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এর জবাবে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হওয়ায় এখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সীমিত সংখ্যক জাহাজই প্রণালি ব্যবহার করতে পারছে।
বিশ্ব নেতারাও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ঘটনাটিকে “অযৌক্তিক” বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের মিত্রদের পাশে থাকবে যুক্তরাজ্য।
এই উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেল-এর দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই দাবি ও ইরানের অস্বীকৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা না ফিরলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক