মুক্তিযোদ্ধা ও অধ্যাপক নাজমা শাহীন দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা ও অপমান করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, কখনো ভাবেননি যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে একদিন গর্বের পরিবর্তে দ্বিধা অনুভব করতে হবে। তার ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যেসব ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে, তা অনেক সময় হতাশাজনক।
নাজমা শাহীন বলেন, তিনি ও তার স্বামী দুজনেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একই সময়ে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নেন। তার স্বামী দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন এবং ম্যাট্রিক ও এইচএসসি পরীক্ষাও কারাগার থেকে দিতে হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তি পান বলেও জানান তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, যেসব মানুষ জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাদের অবদান আজ অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
নারীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেই সময় নারীরা সমাজের সীমাবদ্ধতা ও বাধা অতিক্রম করে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নেন। কেউ কেউ সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে ইতিহাসে নারীদের এই ভূমিকা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে নারীদের অবদান অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে গেছে। এটি শুধু ইতিহাস রচনার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি সামাজিক ব্যর্থতাও বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অনেকেই পরিচয় গোপন করে, স্কুলে যাওয়ার নাম করে বা বিভিন্ন উপায়ে দেশ ছেড়ে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন। এরপর দেশে ফিরে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এসব ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
নাজমা শাহীন অভিযোগ করেন, বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং শহীদদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর আলোচনা তৈরি করা হচ্ছে। তার মতে, শহীদদের সঙ্গে অন্য কোনো আন্দোলনে নিহতদের তুলনা করার প্রবণতা ইতিহাস বিকৃতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ইতিহাসকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে, যা জাতিগত পরিচয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তার বক্তব্যে তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবে ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনায় ভিন্নতা আসছে, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হতে পারে।
এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ তার বক্তব্যকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের আহ্বান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
সব মিলিয়ে, অধ্যাপক নাজমা শাহীন-এর এই বক্তব্য নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান এবং ইতিহাসের ন্যারেটিভ নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।