নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার হাওরাঞ্চলে ডুবে যাওয়া পাকা বোরো ধান কাটতে গিয়ে এক গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্বামীকে কৃষিকাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে জীবন হারানো এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের কল্যাণপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত গৃহবধূর নাম খোকন বেগম (৩৫)। তিনি ওই গ্রামের জামাল মিয়ার স্ত্রী ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলমান হাওরাঞ্চলে ফসল ডুবে যাওয়ার কারণে কৃষকরা ব্যাপক সংকটে পড়েছেন। ডুবে যাওয়া ধান দ্রুত কাটার জন্য স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে মাঠে কাজ করছিলেন। এরই অংশ হিসেবে গৃহবধূ খোকন বেগম তার স্বামীকে সহযোগিতা করতে গ্রামের মসজিদের সামনের হাওরে নামেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই সময় এলাকায় অতিবৃষ্টি এবং প্রবল বাতাস বইছিল। ঠান্ডা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কাজ করতে গিয়ে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি হঠাৎ জমির পাশে ঢলে পড়েন এবং অচেতন হয়ে যান।
পরে স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ঠান্ডাজনিত শারীরিক জটিলতা এবং দুর্বলতার কারণে তার মৃত্যু হতে পারে।
নিহতের স্বামী জামাল মিয়া বলেন, তার প্রায় ১২০ শতাংশ জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল। শ্রমিক না পাওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে গত দুই দিন ধরে ধান কাটছিলেন। তিনি জানান, স্ত্রী নিজে থেকেই কাজের সহযোগিতা করতে মাঠে আসেন। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি ও ঠান্ডার কারণে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই বলছেন, হাওরাঞ্চলে শ্রমিক সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকেরা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের মাঠে নেমে কাজ করতে হচ্ছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষায় কৃষকদের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা প্রশাসনের নজরে রয়েছে। তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং বিধি অনুযায়ী পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, এই ধরনের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি নিহতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, সরকারি সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
হাওরাঞ্চলে এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। প্রতিবছরই ফসল কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকট, আকস্মিক বৃষ্টি এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কৃষক পরিবারগুলো ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো নিজেদের ফসল বাঁচাতে প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামতে বাধ্য হয়।
এই ঘটনাটি আবারও হাওরাঞ্চলের কৃষি নিরাপত্তা, শ্রম ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয়রা দ্রুত সরকারি উদ্যোগে শ্রমিক সহায়তা ও জরুরি কৃষি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যায়।
কসমিক ডেস্ক