মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতিতে দেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই বাড়তি চাপ মোকাবিলায় সরকার করদাতাদের ওপর নতুন কোনো অতিরিক্ত বোঝা চাপাতে চায় না। বরং করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা তুলে ধরেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), চ্যানেল ২৪ এবং দৈনিক সমকাল যৌথভাবে এই আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী বাজেট নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। আগে সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতায় যে দামে এলএনজি কেনা সম্ভব ছিল, এখন তা স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। একইভাবে অপরিশোধিত তেল ও সারের দামও আগের তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে সামগ্রিকভাবে আমদানি ব্যয় বেড়ে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পর্যাপ্ত মজুদ ব্যবস্থা থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্যের সময় তা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। বর্তমানে সেই সুযোগ না থাকায় প্রয়োজনের সময় উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজীকরণ এবং কিছু নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগ নিচ্ছে, যাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আসে। তবে জ্বালানি খাতের উচ্চ ব্যয় এখনো অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। শিল্পকারখানা সচল রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
বাজেট ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে অনেক সময় অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা।
করনীতি বিষয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে, ব্যক্তিগত আয়করের হার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। বরং রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য করের আওতা সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা এবং কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা হবে এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ী মহল থেকে বেশ কিছু প্রস্তাব উঠে আসে। ডিসিসিআই করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, করহার কমানো এবং করপোরেট কর কাঠামো সহজ করার সুপারিশ করে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় কর রিটার্ন ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়, যাতে কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ হয়।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম আরও বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় নতুন করে চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে এলএনজি ও অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে কর সংস্কার এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দেশের বাণিজ্য পরিবেশকে আরও স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। আমদানিনির্ভর খাতে অতিরিক্ত ভ্যাট এবং জটিল রিফান্ড প্রক্রিয়া ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে তারা উল্লেখ করেন। এই প্রক্রিয়াগুলো সহজ করা গেলে ব্যবসার গতি বাড়বে এবং অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে সরকার করদাতাদের স্বস্তি দিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর যে কৌশল নিচ্ছে, তা আগামী বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।