জীবিকার তাগিদে প্রবাসে পাড়ি জমানো অনেক বাংলাদেশির মতোই স্বপ্ন ছিল আবুল খায়েরের। পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানো, সন্তানকে ভালো ভবিষ্যৎ দেওয়া—এই আশা নিয়েই বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হলো না। কিরগিজস্তানে ইটভাটার মাটিচাপায় প্রাণ হারিয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া গ্রামের এই প্রবাসী।
আবুল খায়ের ছিলেন আব্দুল জাব্বারের ছেলে। দেশে থাকাকালে তিনি ভাইদের সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। তবে সেই আয় দিয়ে সংসারের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। উন্নত জীবনের আশায় তিনি পৈতৃক দেড় শতক জমি বিক্রি করেন এবং ধার-দেনা করে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৪ সালের ২৬ মার্চ তিনি কিরগিজস্তানের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন।
বিদেশে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী হামিদা আক্তার ছিলেন সন্তানসম্ভবা। খায়েরের আশা ছিল, সন্তানের জন্মের পর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ভালো আয় করে দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তিনি প্রতিশ্রুত কাজ পাননি। ঢাকার বনানী এলাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে তাকে বলা হয়েছিল সিরামিক কারখানায় চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে সেই কাজ না পেয়ে তাকে বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করতে হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত তিনি একটি ইটভাটায় কাজ নেন। সেখানেই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ইটভাটার মাটিচাপায় তার মৃত্যু হয়। এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর পৌঁছায় তার পরিবারের কাছে, যা তাদের পুরোপুরি ভেঙে দেয়।
খায়েরের স্ত্রী হামিদা আক্তার জানান, ঘটনার দিন সকালে তার স্বামী ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেদিন কাজে যাবেন না। ভিডিও কলে ছেলেকে দেখেছিলেন এবং কিছুক্ষণ কথা বলেছিলেন। সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর। তিনি শিগগিরই দেশে ফিরে এসে ছেলেকে কোলে নেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানান। কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না।
পরবর্তীতে বিকেলে আবার ফোন করলে অপরিচিত একজন ফোন রিসিভ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে খায়েরের মৃত্যুর খবর জানান। এই খবর শোনার পর পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
বর্তমানে খায়েরের ছেলে আরহামের বয়স মাত্র ১৬ মাস। এত ছোট বয়সে বাবাকে হারানোর বাস্তবতা সে এখনও বুঝতে পারে না। মায়ের কোলে বসে সে নির্বাক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে থাকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ।
খায়েরের বড় ভাই রফিক মিয়া জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য খায়ের তার শেষ সম্বল জমিটুকুও বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু বিদেশে গিয়ে ভালো কোনো কাজ পাননি। যখন যে কাজ পেয়েছেন, সেটাই করে গেছেন। বর্তমানে খায়েরের স্ত্রী ও সন্তান তার জায়গায় তৈরি একটি ছোট ঘরে বসবাস করছেন।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, কিরগিজস্তানে যাওয়ার আগে খায়ের কিছুদিন সৌদি আরবেও ছিলেন। তবে সেখানে সুবিধা করতে না পেরে দেশে ফিরে আসেন। এরপর প্রায় দেড় বছর দেশে থাকার পর আবার বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যা শেষ পর্যন্ত তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে, খায়েরের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে। কিরগিজস্তানে অবস্থানরত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, যে ইটভাটায় খায়ের কাজ করতেন, সেখান থেকেই মরদেহ দেশে পাঠানোর খরচ বহন করা হবে। আগামী শনিবার অথবা রবিবারের মধ্যে তার মরদেহ দেশে পৌঁছাতে পারে।
আবুল খায়েরের এই মৃত্যু আবারও প্রবাস জীবনের কঠিন বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়লেও অনেক সময় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় নির্মমভাবে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তিনি গিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে আসছেন নিথর দেহ হয়ে—এ যেন এক অপ্রকাশ্য বেদনার গল্প।