যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা আর স্কুল ব্যাগ—সেই বয়সেই নয় বছরের ছোট্ট ইমরানের সঙ্গী হয়ে উঠেছে চায়ের ফ্লাক্স। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সাভারের বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানে ঘুরে চা বিক্রি করেই চলছে তার জীবন সংগ্রাম।
মাত্র দুই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারায় ইমরান। তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মুহূর্তেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পুরো পরিবার।
ইমরানের বাবা জীবিকার সন্ধানে খুলনা থেকে সাভারে চলে আসেন স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে। সেখানে একটি ভাড়া বাসায় থেকে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। অল্প আয়ের মধ্যেও কোনোভাবে সংসার চলছিল। কিন্তু হঠাৎ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলে সবকিছু থমকে যায়।
বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেন ইমরানের মা। মানুষের বাসায় কাজ করে কোনোভাবে দুই সন্তানকে নিয়ে জীবন চালানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু গত দুই-তিন মাস ধরে অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন তিনি প্রায় শয্যাশায়ী।
ফলে বাধ্য হয়ে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে ছোট্ট ইমরানের কাঁধে।
ইমরান জানায়, তার ছোট বোন আমেনার বয়স সাত বছর। সে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। মা অসুস্থ থাকায় সংসারের সব খরচ এখন তাকেই চালাতে হয়।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চা বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাদের তিনজনের খাবার, ভাড়া ও অন্যান্য খরচ।
বর্তমানে তারা সাভারের ফুলবাড়িয়া বাজার এলাকায় একটি ছোট ভাড়া বাসায় থাকেন। একটি কক্ষের জন্য মাসে তিন হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। এর সঙ্গে খাবার, ওষুধ এবং বোনের পড়াশোনার খরচ জোগানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইমরানের জীবন যেন সময়ের আগেই তাকে বড় করে দিয়েছে।
যে বয়সে তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই সে ব্যস্ত জীবনযুদ্ধে। হাতে বই নয়, বরং ভারী চায়ের ফ্লাক্স নিয়ে তাকে ছুটে বেড়াতে হয় এক দোকান থেকে আরেক দোকানে।
একদিন কাজ না করলে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় দোকানিরা জানান, প্রায় প্রতিদিনই তারা ইমরানকে চা বিক্রি করতে দেখেন। ছোট বয়স হলেও ছেলেটি খুব ভদ্র, পরিশ্রমী এবং দায়িত্বশীল।
অনেক সময় তারা সহানুভূতির জায়গা থেকে তাকে অতিরিক্ত টাকা দেন বা খাবার খেতে দেন।
দোকানিরা বলেন, এত অল্প বয়সে একটি শিশুর এভাবে কাজ করা অত্যন্ত কষ্টের বিষয়। কিন্তু বাস্তবতার নির্মমতার কাছে হার মেনে ইমরানকে এই পথেই নামতে হয়েছে।
ইমরানের এই সংগ্রামী জীবন সমাজের একটি কঠিন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে—দারিদ্র্য, দুর্ঘটনা এবং অসুস্থতার কারণে অনেক শিশুই তাদের শৈশব হারিয়ে ফেলছে।
তার গল্প শুধু কষ্টের নয়, এটি দায়িত্ববোধ, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার এক অনন্য উদাহরণও।
কসমিক ডেস্ক