বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, যেখানে রাশিয়া আগের তুলনায় আরও সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেন যুদ্ধের পরেও দেশটি শুধু টিকে থাকেনি, বরং নতুন সুযোগও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে মনে করে আসছিল, কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে মস্কোকে পিছু হটতে বাধ্য করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চার বছর পরেও রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং তার অর্থনীতিও স্থিতিশীল রয়েছে।
এর অন্যতম কারণ হলো, রাশিয়া এখনো চীন ও ভারতের মতো বড় জ্বালানি ভোক্তা দেশের কাছে তেল ও গ্যাস রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারছে। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সংকট তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ চলাচল করে।
এর ফলে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক চাপে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞার কিছুটা শিথিলতা দেখায় এবং রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার জন্য নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত দেয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক ইউজিন চাউসোভস্কির মতে, ইরান যুদ্ধের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী দেশ হচ্ছে রাশিয়া। একদিকে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ কিছুটা কমেছে।
একইভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক একাতেরিনা মাতোই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি পরিবর্তন দেখাচ্ছে যে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় তারা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ রাশিয়ার জন্য বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে, যা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করবে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আইইএ-এর ইতিহাসে অন্যতম বড় পদক্ষেপ।
এদিকে সামরিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক সরঞ্জাম ব্যয় হচ্ছে, যার ফলে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষক জন মিয়ারশেইমার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ইউক্রেন যুদ্ধেও প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার সামরিক শিল্প খাতও এই পরিস্থিতিতে লাভবান হতে পারে। তাদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরো পরিস্থিতি একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পশ্চিমা জোটের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে, অন্যদিকে রাশিয়া নতুন জোট ও বাজার তৈরি করে নিজ অবস্থান আরও শক্ত করছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই সুবিধাজনক অবস্থান কতদিন থাকবে তা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতির ওপর।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে রাশিয়া কৌশলগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, যা ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কসমিক ডেস্ক