মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায়। ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের তেল আবিবকে লক্ষ্য করে ক্লাস্টার ওয়ারহেডযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। বুধবার (১৮ মার্চ) দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এ তথ্য জানানো হয়।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই হামলা ছিল সরাসরি প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ। তারা তেল আবিবকে লক্ষ্যবস্তু করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত ক্লাস্টার ওয়ারহেড মাঝ আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে অসংখ্য ছোট ছোট বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে এবং বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরান একাধিকবার এই ধরনের ক্লাস্টার ওয়ারহেড ব্যবহার করেছে। মঙ্গলবার রাতে জনবহুল তেল আবিবে চালানো হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন। এতে চলমান সংঘাতে ইসরায়েলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে একই সময়ে ইরানেও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছাকাছি একটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তবে এতে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) জানিয়েছে।
পরমাণু স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি। তিনি এই সংঘাতের মধ্যে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে কোনো পারমাণবিক দুর্ঘটনা না ঘটে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা দুই সপ্তাহেরও বেশি আগে যে সামরিক অভিযান চালায়, তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত রাখা। ওই হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর বড় ধরনের আঘাত আসে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই হামলায় তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পরবর্তীতে একই ধারাবাহিকতায় আলী লারিজানিকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং মঙ্গলবার তার মৃত্যুর বিষয়টি সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, সোমবার রাতে ইসরায়েলের একটি হামলায় লারিজানির ছেলে এবং তার ডেপুটি আলিরেজা বায়াতও নিহত হন। এতে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরাজয় স্বীকার এবং ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত শান্তির সময় আসেনি।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম পররাষ্ট্রনীতি বৈঠকেই খামেনি কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। তবে তিনি সরাসরি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নাকি দূর থেকে অংশ নিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত সপ্তাহে নিহত পিতার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ঘোষণার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ফলে তার নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নীতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
সার্বিকভাবে, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ক্রমেই জটিল ও বিপজ্জনক রূপ নিচ্ছে। পাল্টাপাল্টি হামলা, উচ্চপর্যায়ের নেতাদের নিহত হওয়া এবং পারমাণবিক স্থাপনাকে ঘিরে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
কসমিক ডেস্ক