নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল রক্ষার জন্য নির্মাণ ও সংস্কারাধীন ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা এখনও সম্পন্ন হয়নি। প্রকল্পের সময়সীমা শেষ হয়েছে প্রায় ১৫ দিন আগে। তবে অনেক জায়গায় এখনো মাটি কাটার কাজ শেষ হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে ইতোমধ্যে মৌসুমি বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় আগাম বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে হাওরের কৃষকদের মধ্যে ফসলহানির আশঙ্কা বাড়ছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তদারকিতে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন এবং ৩০ অক্টোবরের মধ্যে প্রকল্প নির্ধারণের কাজ চূড়ান্ত হওয়ার কথা।
এরপর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে আরও ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও কিছু বাঁধের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলায় পাউবোর অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার ডুবন্ত বা অস্থায়ী বাঁধ রয়েছে।
চলতি বছর এসব বাঁধের মধ্যে ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য মোট ২০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই প্রকল্পগুলোর জন্য মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
গঠিত পিআইসিগুলোর মধ্যে খালিয়াজুরী উপজেলায় রয়েছে ১৪৩টি, মোহনগঞ্জে ২৯টি, মদনে ১৯টি এবং কলমাকান্দায় ১০টি প্রকল্প।
সম্প্রতি মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার কয়েকটি হাওর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কিছু বাঁধে এখনও মাটি কাটার কাজই শেষ হয়নি।
আর যেসব বাঁধে মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলোর অনেক জায়গায় ড্রেসিং বা সমান করা এবং দুর্বা ঘাস লাগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
মদন উপজেলার তলার হাওর উপ-প্রকল্পের তিয়শ্রী অংশে ব্রিচ ক্লোজিং বা ভাঙা অংশ মেরামতের কাজ চলছে। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার অংশে এখনো মাটি ফেলা হয়নি।
শনিবার (১৪ মার্চ) পর্যন্ত সেখানে নতুন করে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কাটার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রকল্পের সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ভেকু মেশিন নষ্ট থাকার কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে।
তিনি জানান, ২৩ লাখ টাকার প্রকল্পের বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র দেড় লাখ টাকা বিল পেয়েছেন। ফলে নিজের অর্থ খরচ করে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে মদন উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাঁধের সব কাজ শেষ হওয়ার কথা। কোথাও মাটি কাটার কাজ বাকি আছে—এমন তথ্য আগে জানা ছিল না।
তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে হাওর এলাকার কৃষকরা বলছেন, এসব বাঁধের ওপরই তাদের বোরো ফসল নির্ভর করে।
জেলার প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল এই ফসলরক্ষা বাঁধের মাধ্যমে রক্ষা করা হয়।
এই ফসল বিক্রি করে কৃষকরা সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটান।
খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক রহিদুল মিয়া বলেন, এ বছর অনেক জায়গায় বাঁধের কাজ দায়সারা হয়েছে। কোথাও বালু দিয়ে মাটি দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও কাজই শেষ হয়নি।
তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। যদি আরও কয়েক দিন এভাবে বৃষ্টি হয়, তাহলে হাওরে পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে যেতে পারে।
এই দুর্বল বাঁধ সেই পানি ঠেকাতে পারবে না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, মদন উপজেলার একটি বাঁধে মাটি কাটার কাজ শেষ হয়নি বলে খবর পাওয়া গেছে।
এ কারণে বিষয়টি তদন্ত করতে উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, জেলার অন্যান্য বাঁধে মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে সেখানে ঘাস লাগানোর কাজ চলছে।
তার মতে, এই সময় সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।
উল্লেখ্য, একসময় ঠিকাদারের মাধ্যমে হাওরের বাঁধ মেরামতের কাজ করা হতো।
কিন্তু ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
এরপর ঠিকাদারি ব্যবস্থা বাতিল করে স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসি পদ্ধতি চালু করা হয়।
কসমিক ডেস্ক