দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ১০টি জেলায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। রোববার প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাসে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে কুশিয়ারা নদীর পানি ৯ দশমিক ৪৯ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিপৎসীমার চেয়ে ৪ সেন্টিমিটার বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় এই পানির উচ্চতা আরও ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদী, সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নদীগুলোর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন দিন এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায়ও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব নদীর পানি বেড়েছে এবং আগামী পাঁচ দিন এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে ১ থেকে ৩ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়ার বিভিন্ন স্থানে পানি সতর্কসীমা স্পর্শ করতে পারে। এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে।
গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার পরিস্থিতিও নজরে রাখা হচ্ছে। যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় গঙ্গার পানি কিছুটা কমেছে, তবে পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী দুই দিন পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং পরবর্তী তিন দিনে কিছুটা বাড়লেও তা বিপৎসীমার নিচেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
রংপুর বিভাগের তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানি বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও আগামী তিন দিনে তা বৃদ্ধি পেতে পারে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকটি নদীর পানি ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। সারিগোয়াইন ও যাদুকাটা নদীর পানি বাড়ছে, আর মনু, খোয়াই, ধলাই, সোমেশ্বরী ও ভুগাই-কংস নদীর পানি কিছুটা কমলেও আবারও বাড়তে পারে। এতে শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আগামী চার দিন দেশের রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, অরুণাচল ও মেঘালয় অঞ্চলে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। উজানের এই অতিবৃষ্টির প্রভাব দেশের নদীগুলোর পানির ওপর সরাসরি পড়বে, যা বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে বান্দরবানের লামায়, যেখানে ১৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সিলেটের জাফলংয়ে ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের মেঘালয় ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত নদীর পানি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৪৮টি নদী পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ১২৭টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, ৬৯টিতে কমেছে এবং ৫২টিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে কেবল একটি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে, যা সিলেটের কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
কসমিক ডেস্ক