কুমিল্লার সদর দক্ষিণে জাইতুন রেস্টুরেন্টে নাস্তা খাওয়ার পর ভুলবশত ফেলে যাওয়া পাকিস্তানি শিশুকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শনিবার (২৭ জুন) বিকেল পৌনে ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন চন্দ্র রায় শিশুটিকে পরিবারের হাতে তুলে দেন। এ সময় উপজেলা সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রশাসন জানিয়েছে, শিশুটির নাম নাফিসা। সে পাকিস্তান থেকে আসা একটি পরিবারের সদস্য। পরিবারটি সপরিবারে বাংলাদেশে ভ্রমণে এসেছে এবং কক্সবাজার যাওয়ার পথে কুমিল্লায় যাত্রাবিরতি করে নাস্তা করছিল। পরে ভুলবশত শিশুটি রেস্টুরেন্টে রয়ে যায়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর প্রশাসন ও পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ জানায়, পাকিস্তানের কাশ্মীরের নাগরিক সালমান তার পরিবার নিয়ে শনিবার কক্সবাজার ঘুরতে যাচ্ছিলেন। পথে সকালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের মোস্তফাপুর এলাকার জাইতুন রেস্টুরেন্টে তারা নাস্তা করেন। নাস্তা শেষে পরিবারের সদস্যরা দুটি গাড়িতে করে রওনা দেন। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কারণে শিশু নাফিসা রেস্টুরেন্টেই থেকে যায়। এক গাড়িতে শিশুর বাবা-মা এবং অন্য গাড়িতে দাদা-দাদি ছিলেন। বাবা-মায়ের ধারণা ছিল, নাফিসা দাদা-দাদির গাড়িতে উঠেছে। আর দাদা-দাদির ধারণা ছিল, শিশুটি বাবা-মায়ের গাড়িতে আছে। এই ভুলের কারণেই শিশুটি রেস্টুরেন্টে রয়ে যায়।
রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বিদেশি পরিবারটি প্রায় ১৫ জন সদস্য নিয়ে দুটি গাড়িতে করে এসে জাইতুন রেস্টুরেন্টে বসে নাশতা করছেন। এ সময় তারা গল্প-আড্ডায় মেতে ছিলেন। নাস্তা শেষে সবাই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যান। পরে শিশুটি না থাকায় পরিবারটি বিষয়টি বুঝতে পারে এবং ফিরে আসার চেষ্টা করে।
জাইতুন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী লুৎফুর রহমান রিপন বলেন, পাকিস্তানের কাশ্মীরের একটি পরিবার শনিবার সকালে দুটি গাড়িতে করে এসে প্রায় ১৫ জন সদস্য রেস্টুরেন্টে নাস্তা করেন। তারা চলে যাওয়ার সময় ভুলবশত শিশুটিকে রেখে চলে যান। পরে বাচ্চাটিকে হেফাজতে নিয়ে সদর দক্ষিণ থানায় জানানো হয়। পুলিশ এসে শিশুটিকে উদ্ধার করে। এরপর প্রশাসনের মাধ্যমে শিশুটিকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সদর দক্ষিণ থানার ওসি রকিকুল ইসলাম বলেন, রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়। পরে সমাজসেবা অফিসারের মাধ্যমে পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ফিরে আসেন। আইন অনুযায়ী শিশুটিকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, শিশুটি নিরাপদে ছিল এবং পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসন ও পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।
সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র রায় বলেন, প্রথমে তারা শুনেছিলেন শিশুটির পরিবার কাশ্মিরের। কিন্তু পরিবারের লোকজন শিশুটিকে নিতে এলে জানা যায়, তারা পাকিস্তানি নাগরিক। পাকিস্তান থেকে পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে ঘুরতে এসেছেন। শনিবার দুটি গাড়িতে করে সবাই কক্সবাজার যাচ্ছিলেন। সকালে কুমিল্লার জাইতুন রেস্টুরেন্টে নাস্তা করেন। নাস্তা শেষে পাকিস্তানি পরিবারটি দুটি গাড়িতে রওনা দেয়। একটিতে শিশুর বাবা-মা এবং অপরটিতে দাদা-দাদি ছিলেন। বাবা-মায়ের ধারণা ছিল দাদা-দাদির গাড়িতে শিশু নাফিসা আছে, আর দাদা-দাদির ধারণা ছিল শিশুটি বাবা-মায়ের গাড়িতে উঠেছে। উভয়ের ভুলে শিশু নাফিসা হোটেল জাইতুনে রয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, পরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল এলাকায় গিয়ে শিশুটিকে দেখতে না পেয়ে পরিবারটি কুমিল্লার দিকে রওনা দেয়। এদিকে উপজেলা সমাজসেবা অফিস পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুটির অবস্থান নিশ্চিত করে। এরপর তারা জাইতুন রেস্টুরেন্টে এসে শিশুটিকে নিয়ে পুনরায় কক্সবাজারের দিকে রওনা দেন। প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে শিশুটি নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছে বলে তিনি জানান।
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভ্রমণের সময় সামান্য অসতর্কতা কীভাবে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি উদাহরণ। তবে দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগ, পুলিশের তৎপরতা এবং রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় শিশুটি নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, কুমিল্লার সদর দক্ষিণে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি মানবিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভুলবশত ফেলে যাওয়া পাকিস্তানি শিশু নাফিসাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক