প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সরকারি চীন সফর শেষে বাংলাদেশ ও চীন একটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে দুই দেশ তাদের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গড়ে তোলার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে বিস্তৃত ঐকমত্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করেন। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত নিউ চ্যাম্পিয়ন্স ২০২৬-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন এবং পরে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
দুই দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিদ্যমান ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্ব’-কে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এ লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়মিত রাখা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্ভাব্য ‘২+২ সংলাপ’ চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
যৌথ ঘোষণায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।
বাংলাদেশ আবারও ‘এক চীন’ নীতির প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং দেশের উন্নয়নপথ নির্ধারণের অধিকারকে সম্মান জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় অবকাঠামো, শিল্পায়ন, কৃষি, ই-কমার্স, বিনিয়োগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
দুই দেশ যৌথভাবে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির নতুন সুযোগ খুঁজে দেখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
যৌথ ঘোষণায় তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী খনন, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী সহযোগিতা করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতেও দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষা, গবেষণা, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া, যুব উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখার আশ্বাসও পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করে মিয়ানমার সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধানে সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে চীন।
সফরের সময় উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সরকার ও জনগণের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
কসমিক ডেস্ক