বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে দুর্ভোগ বেড়েছে সিরাজগঞ্জের নদীতীরবর্তী জনপদে। বিশেষ করে কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের কারণে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে অন্তত ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে এবং আরও শতাধিক পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশি ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য আল আমিন সরকার জানান, চরগিরিশ চরে একসময় ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল। নদীভাঙনের কারণে এরই মধ্যে প্রায় ১৫০টি পরিবার অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সাম্প্রতিক ভাঙনে আরও অন্তত ৩০টি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় দিয়ে নির্মিত ঘরবাড়ি অল্প সময়ের ব্যবধানে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। কেউ কেউ বর্তমানে অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তাদের সামনে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চর এলাকায়ও প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত ১০ দিনে এসব এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, মসজিদ ও দোকানপাটসহ অন্তত ৩০টি স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেকেই স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরুল আমিন জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙনরোধে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলার কাজ করছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাতেও ভাঙনের আশঙ্কা বাড়ছে। অনেক চরাঞ্চলে আবাদি জমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও নৌকাই হয়ে উঠেছে একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উভয় পয়েন্টেই পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় নদীতীর রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, চৌহালী ও সিরাজগঞ্জ সদরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভাঙনরোধে কাজ চলছে। তবে যমুনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ভাঙন দেখা দিলে সব এলাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। তিনি জানান, চরাঞ্চল রক্ষায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
কসমিক ডেস্ক