ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন ভোটাররা আলাদা ব্যালটে চারটি সংক্ষিপ্ত বিষয়ের ওপর ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন। যদিও ব্যালটে মাত্র চারটি পয়েন্ট উল্লেখ থাকবে, বাস্তবে এই গণভোটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর এই ৮৪টি প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার এবং বাকি ৩৭টি সাধারণ আইন, অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
প্রথমে প্রস্তাব ছিল—যেসব সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট থাকবে, তারা ক্ষমতায় গেলে সেগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। তবে এই বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় সরকার শেষ পর্যন্ত গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ ৮৪টি সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর ‘না’ জয়ী হলে পুরো জুলাই সনদই বাতিল হয়ে যাবে।
ভাষা, জাতি ও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো
বর্তমান সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার স্বীকৃতি নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে বাংলার পাশাপাশি দেশের সব মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
এ ছাড়া এত দিন নাগরিক পরিচয় ছিল ‘বাঙালি’; সংস্কারের পর তা পরিবর্তিত হয়ে হবে ‘বাংলাদেশি’।
সংবিধানের মূলনীতি হিসেবেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে মূলনীতি হলো—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। জুলাই সনদ কার্যকর হলে এগুলোর পরিবর্তে যুক্ত হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
সংবিধান সংশোধন ও মৌলিক অধিকার
বর্তমানে সংবিধান সংশোধনে শুধু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদ অনুযায়ী, নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। সংবিধানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনে গণভোট বাধ্যতামূলক হবে।
বর্তমান সংবিধানে থাকা সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান বাতিল করা হবে। মৌলিক অধিকার তালিকায় যুক্ত হবে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য
জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা থাকবে না। মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং বিরোধী দলীয় নেতৃত্বকে ওই বৈঠকে থাকতে হবে। জরুরি অবস্থাতেও মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদের দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোটে। প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না এবং এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থা
সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য থাকবে, যারা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন।
নারীদের সংরক্ষিত আসন ধাপে ধাপে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে।
ডেপুটি স্পিকার হবেন বিরোধী দল থেকে। বাজেট ও আস্থা ভোট ছাড়া এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন।
বিচার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে আপিল বিভাগ থেকে। বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।
ন্যায়পাল, দুদক, পিএসসি, মহাহিসাব নিরীক্ষকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
আইন ও প্রশাসনিক সংস্কার
৩৭টি সংস্কার আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
-
বিচার বিভাগের ডিজিটাল সংস্কার
-
স্বতন্ত্র তদন্ত সার্ভিস
-
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন
-
নতুন প্রশাসনিক বিভাগ (কুমিল্লা ও ফরিদপুর)
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের ব্যালটে এসব বিস্তারিত কিছুই থাকবে না। ভোটাররা মাত্র চারটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের বিপরীতে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন। অথচ সেই ভোটের ফলই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামো।
কসমিক ডেস্ক