চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী ও সাগরের জলসীমায় বর্তমানে ৭২০টি লাইটার জাহাজ পণ্যবোঝাই অবস্থায় ভাসছে। এসব জাহাজকে কার্যত ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে তেল, চিনি, ডাল, গম, সারসহ ১০ লাখ টনের বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাগরে আটকে রয়েছে। কোনো কোনো জাহাজ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পণ্য খালাস না করে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে তৈরি হয়েছে গুরুতর জট। পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ না থাকায় বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষায় রয়েছে ১৩৪টি মাদার ভেসেল, যেগুলোর মধ্যে অর্ধশত জাহাজে রয়েছে চিনি, তেল, ছোলা ও গমের মতো খাদ্যপণ্য।
শিপিং এজেন্টদের তথ্য অনুযায়ী, একটি বড় জাহাজ প্রতিদিন অলস বসে থাকলে গড়ে ২০ হাজার ডলার বা প্রায় ২৫ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়ে। ফলে এই বিলম্ব আমদানিকারক ও শিপিং খাতে আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাগরে ভাসতে থাকা পণ্যের বড় একটি অংশ মাত্র ছয়টি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের। এগুলো হলো—টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপ। এর মধ্যে আকিজ গ্রুপের অধীনে একাই প্রায় ৮০টি লাইটার জাহাজ পণ্যবোঝাই অবস্থায় রয়েছে। নাবিল ও মেঘনা গ্রুপের অধীনে রয়েছে প্রায় ৫০টি করে লাইটার।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রাথমিক তালিকায় আরও উঠে এসেছে—নাবিল গ্রুপ, আরবি এগ্রো, নোয়াপাড়া ট্রেডার্স, শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, শেখ ব্রাদার্স ও স্পেকট্রাসহ এক ডজন আমদানিকারক ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। এদের পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে পণ্য খালাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অধিদপ্তর।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী বলেন, সাগরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। ইচ্ছাকৃতভাবে যারা পণ্য খালাসে বিলম্ব করছে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালানো হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় একটি লাইটার জাহাজ ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো লাইটার ২০ থেকে ৩০ দিন ধরে ভাসছে। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জাহাজে পণ্য রাখলে গুদামভিত্তিক নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এড়ানো যায়। একই সঙ্গে সংকট দেখিয়ে বাজারে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। রমজান সামনে রেখে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
এরই মধ্যে ভাসমান গুদাম ব্যবহারের অভিযোগে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত মুন্সীগঞ্জে দুটি লাইটার জাহাজকে জরিমানা করেছে এবং আরও অভিযান চলমান রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত না করা গেলে রমজান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যার চাপ পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
কসমিক ডেস্ক