মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি আরব। নিজ ভূখণ্ড, জ্বালানি স্থাপনা ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ওপর বারবার ইরানি হামলার অভিযোগে রিয়াদে নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাশে, সহকারী সামরিক অ্যাটাশে এবং আরও তিন কর্মীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করেছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬ তারিখের বিবৃতিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, বেসামরিক অবকাঠামো, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে চলমান হামলার প্রেক্ষাপটে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বড় অংশই সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করেছে, কিন্তু তবুও এসব হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে মারাত্মকভাবে অস্থির করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব দাবি করেছে যে চলমান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা শত শত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল বিশেষ করে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, যা দেশটির অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। একই সঙ্গে রাজধানী রিয়াদেও হুমকি তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের এই অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তার এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে বিস্তৃত সংঘাত, যার অভিঘাত এখন উপসাগরীয় দেশগুলোতেও সরাসরি পড়ছে। রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক উপসাগরীয় দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক চাপই বাড়েনি, বরং জ্বালানি রপ্তানি, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুতধারী দেশ সৌদি আরবের জন্য এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত মানে শুধু জাতীয় নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক তেলবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হওয়া। রয়টার্সের পৃথক এক প্রতিবেদনে ইয়ানবু বন্দর ও আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর হামলার প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে, যা দেখায় যে সংঘাতের অর্থনৈতিক মাত্রা দ্রুত বাড়ছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ চলতি সপ্তাহে বলেছিলেন, ইরানের ওপর থেকে আস্থা “চুরমার” হয়ে গেছে এবং সৌদি আরব নিজের দেশকে রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার রাখে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজন হলে সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ তাদের উল্লেখযোগ্য সামরিক ও প্রতিরক্ষাগত সক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, রিয়াদ আপাতত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিলেও সামগ্রিকভাবে তাদের অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়েছে।
এ পদক্ষেপ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মাত্র তিন বছর আগে ২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সমঝোতায় পৌঁছেছিল। সেই সমঝোতার পর দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা কিছুটা কমার আশা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ, একের পর এক হামলার অভিযোগ এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ফলে সেই আস্থার ভিত্তি আবারও ভেঙে পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, ইরানের ধারাবাহিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেবে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। অর্থাৎ, এই বহিষ্কার কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং রিয়াদের পক্ষ থেকে একটি কৌশলগত বার্তা—ইরান যদি হামলা বন্ধ না করে, তাহলে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও দ্রুত অবনতি হতে পারে।
এর আগে কাতারও দোহায় নিযুক্ত ইরানি সামরিক ও নিরাপত্তা অ্যাটাশেদের ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কাতারের এ সিদ্ধান্ত এবং সৌদি আরবের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের বিরুদ্ধে আরও সমন্বিত ও দৃশ্যমান কূটনৈতিক অবস্থানে যাচ্ছে। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরানি হামলার অভিযোগ, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের বিস্তার—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কূটনৈতিক বহিষ্কারের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও বড় আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার সূচনা কিনা, এখন সেটিই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্ব।
কসমিক ডেস্ক