ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক ছবি ছড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় আসে।
এসব ভুয়া ছবিতে মেলোনিকে নতুন চুলের স্টাইল করা, একা ভ্রমণের পরিকল্পনা, ম্যারাথনের প্রস্তুতি এবং ডেটিং অ্যাপে প্রোফাইল খোলার মতো দৃশ্যে দেখানো হয়েছে। যদিও ছবিগুলো বাস্তব নয়, তবে এগুলো দুই নেতার রাজনৈতিক দূরত্বকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করায় ইতালির সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মাত্র কয়েক মাস আগেও পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসা একমাত্র ইউরোপীয় নেতা ছিলেন জর্জিয়া মেলোনি। এছাড়া ইউরোপীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি হিসেবেও তাকে মনোনীত করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনি ও ট্রাম্পের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক ছিল না; এটি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মেলোনির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই নেতার সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। মার্চ মাসের শেষ দিকে ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংসদের অনুমোদন ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যগামী মার্কিন সামরিক বিমানকে সিসিলির সিগোনেলা ন্যাটো ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইতালির সংবিধান ও যুদ্ধবিরোধী জনমতের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এর কয়েক সপ্তাহ পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়, যখন ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোপ লিও চতুর্দশের সমালোচনা করেন। যুদ্ধ বিষয়ে পোপের অবস্থানের জবাবে তিনি তাকে অপরাধ দমনে দুর্বল বলে মন্তব্য করেন। ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইতালির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেলোনি ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন এবং পোপের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি মেলোনির আচরণে বিস্মিত হয়েছেন এবং তিনি আর আগের মতো নেই। এমনকি তিনি মন্তব্য করেন, ইতালিও আগের অবস্থায় নেই। এই বক্তব্য দুই নেতার সম্পর্কের দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
জুন মাসে ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে দুই নেতাকে দীর্ঘ সময় আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যায়। বৈঠক শেষে ইতালির কর্মকর্তারা জানান, উভয় পক্ষ ভুল বোঝাবুঝি নিরসনের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। মেলোনিও বৈঠকের পরিবেশকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন।
তবে সেই ইতিবাচক আবহ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কয়েকদিন পর ইতালির টেলিভিশন চ্যানেল লা৭-কে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, জি-৭ সম্মেলনে মেলোনি তার সঙ্গে ছবি তুলতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, নিজে ছবি তুলতে না চাইলেও মেলোনির জন্য শেষ পর্যন্ত রাজি হন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের জবাবে মেলোনি একটি ভিডিও বার্তায় অভিযোগটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কেন তার মিত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন, তা তার বোধগম্য নয়। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ইতালি কখনো কারও কাছে অনুরোধ বা ভিক্ষা করে না।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দুই নেতার মধ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক দূরত্ব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। যদিও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে, তবুও বিভিন্ন ইস্যুতে প্রকাশ্য মতবিরোধ ইতালি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কসমিক ডেস্ক