কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে সৃষ্ট বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির প্রশাসন, নীতিনির্ধারক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, এআই শিল্প থেকে অর্জিত সম্ভাব্য বিপুল মুনাফা শুধু কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ জনগণের কাছেও পৌঁছানো উচিত।
এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন নীতিগত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কীভাবে এআই শিল্পের আর্থিক সাফল্যের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে বণ্টন করা যায় এবং একই সঙ্গে উদ্ভাবন ও বিনিয়োগের পরিবেশও বজায় রাখা যায়।
প্রস্তাবিত ধারণাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বড় এআই কোম্পানিগুলোর মালিকানায় সরকারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সমর্থকদের মতে, এতে রাষ্ট্রের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি আর্থিক সুবিধা পেতে পারে এবং জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধিকতর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে মার্কিন রাজনীতিক Bernie Sanders এআই খাতের বড় প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য সরকারি মালিকানার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অর্থনৈতিক সুফল সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছানো প্রয়োজন।
আরেকটি আলোচিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোম্পানিগুলো প্রচলিত করের একটি অংশ নগদ অর্থের পরিবর্তে শেয়ারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে পারে। এতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকারি তহবিলের মালিকানা বৃদ্ধি পাবে এবং সরাসরি অতিরিক্ত করের চাপও কম থাকবে।
এছাড়া এআই অবকাঠামো, গবেষণা এবং চিপ উৎপাদনে সরকারি অর্থায়নের বিনিময়ে মালিকানা অংশ নেওয়ার ধারণাও আলোচনায় রয়েছে। সমর্থকদের মতে, যখন জনসম্পদ ও সরকারি বিনিয়োগ একটি শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তখন সেই শিল্পের সাফল্যে জনগণেরও অংশ থাকা যৌক্তিক।
এদিকে OpenAI একটি “পাবলিক ওয়েলথ ফান্ড” ধরনের ধারণা সামনে এনেছে বলে জানা গেছে। এই মডেলে একটি তহবিল বিভিন্ন এআই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করবে এবং সেখান থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ নাগরিকদের মধ্যে বণ্টন করা হতে পারে।
অন্যদিকে Anthropic “ডিজিটাল ডিভিডেন্ড” ধারণা নিয়ে আলোচনা করছে। এ ধারণা অনুযায়ী, এআই খাত থেকে সংগৃহীত করের একটি অংশ সরাসরি নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের মডেলের সঙ্গে Alaska Permanent Fund-এর তুলনা করছেন। ওই তহবিলের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ নিয়মিতভাবে বাসিন্দাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। এখন একই ধরনের কাঠামো প্রযুক্তি খাতেও কার্যকর করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কিছু অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক মনে করেন, সরকার যদি একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক এবং বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করে, তাহলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা, নীতিনির্ধারণ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে সমর্থকরা বলছেন, এআই শিল্পের বিকাশে সরকারি গবেষণা, অবকাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের তৈরি বিপুল তথ্যভান্ডারেরও অবদান রয়েছে। ফলে এই খাতের আর্থিক সাফল্যের একটি অংশ জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এআই শিল্পের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের নীতিগত উদ্যোগ বৈশ্বিক পর্যায়েও আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে।
কসমিক ডেস্ক