সত্য সাহা: সুরে সুরে যিনি লিখেছেন জীবনের গল্প The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

সত্য সাহা: সুরে সুরে যিনি লিখেছেন জীবনের গল্প

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 27, 2026 ইং
সত্য সাহা: সুরে সুরে যিনি লিখেছেন জীবনের গল্প ছবির ক্যাপশন:
ad728

বাংলাদেশি সিনেমা ও গানের ইতিহাসে এমন কিছু স্রষ্টা আছেন, যাঁদের সৃষ্টি সময়ের সীমা অতিক্রম করে প্রজন্মের পর প্রজন্মে বেঁচে থাকে। সত্য সাহা তাঁদের অন্যতম। সুরকার, সংগীত পরিচালক, গায়ক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে তিনি বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতকে দিয়েছেন এক স্বতন্ত্র ভাষা—যেখানে আবেগ, মানবতা, প্রেম, বিরহ আর জীবনের দর্শন মিলেমিশে একাকার।

১৯৩৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নন্দীরহাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সত্য সাহা। জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও তিনি বেছে নেন সুরের পথ। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে ভিন্ন এক জীবনের দিকে টেনে নেয়। স্কুলজীবনে তিনি উচ্চাঙ্গসংগীতে তালিম নেন পণ্ডিত সুপর্ণা নন্দীর কাছে এবং ভজন গানে দক্ষতা অর্জন করেন।

১৯৪৮ সালে নারায়ণ রামকৃষ্ণ স্কুল থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৫২ সালে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন সত্য সাহা। চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ থাকলেও সংগীতের প্রতি অদম্য টান তাঁকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে কলকাতায় সহকারী সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর পেশাদার সংগীতজীবনের সূচনা হয়। এ সময় তিনি ভারতের প্রখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরীর সহকারী হিসেবেও কাজ করেন, যা তাঁর সৃষ্টিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

১৯৫৬ সালে বাংলাদেশ বেতারে সুরকার পঞ্চানন মিত্রের সহকারী হিসেবে যুক্ত হন সত্য সাহা। পরে ১৯৬১ সালে বেতারের কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন এবং একই বছর ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গায়ক হিসেবে ঢাকাই চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। যদিও ‘জানাজানি’ ছিল তাঁর প্রথম সুরারোপিত চলচ্চিত্র, তবে ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সুতরাং’ ছবির মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন শক্তিমান সংগীত পরিচালক হিসেবে।

সত্য সাহার সুরে ছিল গভীর আবেগ ও গল্প বলার ক্ষমতা। ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, ‘তুমি আসবে বলে’, ‘নীল আকাশের নিচে আমি’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’, ‘একদিন ছুটি হবে’—এমন অসংখ্য গান আজও শ্রোতার হৃদয়ে সমানভাবে আলোড়ন তোলে। প্রেম, দেশপ্রেম, লোকজ আবহ, প্রতিবাদ কিংবা মানবিক বেদনা—সব ধারায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল।

চলচ্চিত্র সংগীতে তাঁর অবদান ছিল ব্যাপক। ‘রূপবান’, ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘দীপু নাম্বার টু’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘অজান্তে’, ‘চুড়িওয়ালা’সহ শতাধিক চলচ্চিত্রে তাঁর সুর বাংলা সিনেমাকে দিয়েছে গভীরতা ও স্থায়িত্ব।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি ছিলেন সক্রিয়। কলকাতায় অবস্থান করে ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’, ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ ও ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’—এই চারটি প্রামাণ্যচিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং ২০১৩ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।

১৯৯৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ৬৫ বছর বয়সে সত্য সাহার জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর সুর আজও বলে চলে—জীবন কখনো পরাজয়ের নয়, বরং অনুভূতির এক দীর্ঘ সংগীতযাত্রা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সামরিক বাহিনীর মর্যাদা প্রশ্নে আপস নয়: খালিদুজ্জামানকে ঘিরে

সামরিক বাহিনীর মর্যাদা প্রশ্নে আপস নয়: খালিদুজ্জামানকে ঘিরে