বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বাধ্যতামূলক অবসর নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জানা গেছে, আগামী ৩১ মে এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হবে এবং তাদের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকায় রয়েছেন।
সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত অনেক কর্মকর্তা বর্তমানে সংযুক্ত বা ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) হিসেবে রয়েছেন। এর আগে ১৫তম, ১৭তম এবং ১৮তম ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, তালিকায় থাকা অনেক কর্মকর্তা সাবেক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় কিছু কর্মকর্তা অতিউৎসাহী হয়ে নানা অনিয়ম ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরীহ মানুষের ওপর হামলা ও গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে।
এছাড়া, কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম ও হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। সরকার পতনের পর এমন অভিযোগে অভিযুক্ত অনেক কর্মকর্তা আত্মগোপনে চলে যান। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং অনেককে সংযুক্ত করে রাখা হয়।
বর্তমানে অভিযোগ রয়েছে, এদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সরকার পতনের পর এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন খুনের মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে, পুলিশের ভেতরে একটি অংশ এই কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের যুক্তি, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে না দিলে বাহিনীর ভাবমূর্তি ও পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে অন্য একটি পক্ষ ভিন্ন মত পোষণ করছে। তাদের মতে, যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাহলে তাদের অবসরে পাঠানো ঠিক হবে না। কারণ, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে, বিগত সরকারের সময় পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের আমলনামা (সার্ভিস রেকর্ড) পর্যালোচনা চলছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্র জানায়, ২০তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে ডিআইজি জামিল হাসান অন্যতম আলোচিত নাম। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিস্তীর্ণ জমি, রিসোর্ট, গরুর খামার, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং একাধিক গাড়ি। এসব অভিযোগের তদন্তে দুদক ইতোমধ্যে একজন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে।
অন্যদিকে, রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে সংযুক্ত থাকা মোল্যা নজরুল ইসলামকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এসব ঘটনা পুলিশ বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সর্বশেষ গত ২২ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১১ জন ডিআইজি এবং দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই বাহিনীর ভেতরে চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পুলিশের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হলে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, বাধ্যতামূলক অবসর ইস্যু এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি পুলিশ বাহিনীর ভবিষ্যৎ কাঠামো ও পেশাদারিত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক