দেশে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৪ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে সারা দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। এতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে নারী ছিলেন ৪৬ জন এবং শিশু ৬৭ জন, যা সামগ্রিকভাবে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা নির্দেশ করে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণ হয়েছে। ১৪৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৮ দশমিক ৯২ শতাংশ।
এছাড়া পথচারীদের মধ্যেও প্রাণহানির ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এই সময়ে ৪৭ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। চালক ও সহকারীদের মধ্যে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন, যার হার প্রায় ১২ দশমিক ০৮ শতাংশ।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাসযাত্রীদের মধ্যে ৪১ জন নিহত হয়েছেন। থ্রি-হুইলার যাত্রীদের মধ্যে প্রাণহানি হয়েছে ৫০ জনের, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ২০ জন এবং ট্রাক-পিকআপে ১৩ জন। মোট ৬১৮টি যানবাহন এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল, যার মধ্যে ১৫৩টি মোটরসাইকেল এবং ১৩৮টি থ্রি-হুইলার।
সড়কের ধরন অনুযায়ী দুর্ঘটনার হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে—প্রায় ৪৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার ছিল ৩০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। শহরের সড়কে ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং গ্রামীণ সড়কে ১২ দশমিক ৮৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নিয়ন্ত্রণ হারানোই সবচেয়ে বড় কারণ, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষে ২৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং পথচারীকে চাপা দেওয়ার ঘটনায় ১৩ দশমিক ১৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সকাল ও দুপুরে দুর্ঘটনার হার তুলনামূলক বেশি।
অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এ বিভাগে ৯৩টি দুর্ঘটনায় ৭৪ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রামেই সর্বোচ্চ ৩২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এবারের ঈদে রাজধানী থেকে এক কোটির বেশি মানুষ গ্রামে গেছেন এবং সারা দেশে প্রায় চার কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। দীর্ঘ ছুটি থাকায় চাপ কিছুটা কমলেও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, অতিরিক্ত ভাড়া এবং অনিরাপদ যানবাহনের কারণে ভোগান্তি বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তুলনায় দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ, যদিও প্রাণহানি কমেছে ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে এই হ্রাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছে সংস্থাটি। জ্বালানি সংকটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার কিছুটা কমায় মৃত্যুহার কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালনাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সংস্থাটি অন্তত তিন বছর মেয়াদি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এতে রেলপথ সম্প্রসারণ, নৌপরিবহন উন্নয়ন, বিআরটিসির বাস সংখ্যা বৃদ্ধি, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং মহাসড়কে আলাদা সার্ভিস রোড নির্মাণের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
সবশেষে সংস্থাটি জানিয়েছে, সমন্বিত নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ভবিষ্যতে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কঠোর মনোযোগ।
কসমিক ডেস্ক