বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে একটি ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মুহূর্তেই বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাত প্রায় ১১টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের পঞ্চম তলার মেডিসিন ওয়ার্ডের এক পাশে আগুন লাগার পর পুরো হাসপাতালজুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
রাতের নীরব পরিবেশে হঠাৎ তীব্র ধোঁয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে বিষয়টি অনেকে বুঝতে পারেননি। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘আগুন! আগুন!’ চিৎকারে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। রোগী, তাদের স্বজন, নার্স ও চিকিৎসকরা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং রোগীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হিমশিম খেতে থাকেন।
আগুনটি বড় আকার ধারণ না করলেও ধোঁয়ার কারণে পুরো তলা ঢেকে যায়। ফলে আতঙ্কিত মানুষজন দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই তাড়াহুড়ার মধ্যেই দুইজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
নিহতরা হলেন পটুয়াখালীর বদরপুর এলাকার কাজী আতাউর রহমান (৮০) এবং বরিশাল সদরের হাটখোলা এলাকার আবুল হোসেন (৬৭)। তাদের মৃত্যু নিয়ে স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মেডিসিন ওয়ার্ডের একটি কর্নারে রাখা রোগীদের বিছানার ফোম, চাদর ও বালিশ থেকে প্রথমে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এরপর দ্রুতই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। ধোঁয়া এত ঘন ছিল যে আগুনের উৎস নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আগুন লাগার পরপরই হাসপাতালের স্টাফ ও স্থানীয়রা মিলে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। তবে ধোঁয়া ও তাপের কারণে প্রাথমিক প্রচেষ্টা খুব বেশি কার্যকর হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।
প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়ে চারজন আনসার সদস্যসহ মোট ছয়জন অসুস্থ হয়ে পড়েন।
নিহত কাজী আতাউর রহমানের স্বজনদের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন এবং অক্সিজেনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। আগুন লাগার সময় তাকে অক্সিজেন ছাড়া নিচে নামানো হয়। তার পরিবারের দাবি, নিচে নামানোর পর দ্রুত অক্সিজেনের ব্যবস্থা না হওয়ায় তার মৃত্যু ঘটে।
অন্যদিকে, আবুল হোসেন কয়েকদিন ধরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার ছেলে জানান, আগুনের খবর পেয়ে তিনি দ্রুত হাসপাতালে আসেন, কিন্তু এসে দেখেন তার বাবা আর বেঁচে নেই।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, নিহত দুই রোগীর অবস্থাই আগে থেকেই গুরুতর ছিল। শেবাচিম হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (অর্থ ও ভাণ্ডার) ডা. আবদুল মুনায়েম সাদ জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের বরিশাল স্টেশনের স্টেশন অফিসার আবুজর গিফরী বলেন, ধোঁয়ার কারণে আগুন নেভাতে কিছুটা সময় লেগেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিড়ি-সিগারেট বা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্তের পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নাজমুল আহসান জানান, নতুন ভবনের দুটি ইউনিটে প্রায় ১০০ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। আগুন লাগার পর সবাইকে দ্রুত সরিয়ে পুরোনো ভবনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে, অগ্নিকাণ্ডটি বড় আকার না নিলেও ধোঁয়া ও আতঙ্কে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী স্থানান্তরের প্রস্তুতি ও অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় সেবার নিশ্চয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
কসমিক ডেস্ক