রংপুর-৩ সংসদীয় আসনে অবাধে নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ থাকলেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য জিএম কাদেরকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে অনাস্থা ও দূরত্বের চিত্র উঠে আসছে। ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর’ তকমা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রশ্নে অবস্থান নিয়ে ওঠা অভিযোগ তার নির্বাচনী প্রচারণাকে প্রভাবিত করছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় জিএম কাদেরের অবস্থান ভোটারদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘না’-এর পক্ষে ভোট চাওয়ার বিষয়টিও বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়েই তিনি নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
রংপুর-৩ আসনটি রংপুর সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ চার হাজার ১৩৬ জন এবং মোট ভোটকেন্দ্র ১৬৯টি। এর আগের সংসদ নির্বাচনে জিএম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সদর উপজেলার মমিনপুর, হরিদেবপুর ইউনিয়ন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লাসহ অন্যান্য প্রতীকের পাশাপাশি লাঙ্গল প্রতীকের ব্যানার–ফেস্টুন টাঙানো রয়েছে। মাইকিং ও প্রচার কার্যক্রমে কোথাও বাধার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানীয় ভোটারদের একটি অংশ বলছেন, অতীতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের আলাদা করে ভোট চাইতে হতো না। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় এই এলাকায় জাতীয় পার্টির প্রভাব ছিল শক্ত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি বদলেছে। তাদের অভিযোগ, জিএম কাদের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী থাকা অবস্থায় এলাকার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেননি। উন্নয়ন বরাদ্দ দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।
রংপুর সদর উপজেলার চন্দনপাঠ ইউনিয়নের রাজ মিয়া, লালবাগ বাজারের ব্যবসায়ী মোকলেসুর রহমান এবং গোলাপ হোসেন জানান, এবার জিএম কাদেরকে ভোট দিলেও এলাকার উন্নয়ন হবে—এমন বিশ্বাস তাদের নেই। জুলাই আন্দোলনে তার প্রকাশ্য অবস্থানও ভোটারদের মনে ক্ষোভ তৈরি করেছে বলে তারা জানান।
জুলাই আন্দোলনের এক কর্মী ইমতিয়াজ ইমতি বলেন, যারা পরিবর্তনের পক্ষে আন্দোলন করেছেন, তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সেখানে জিএম কাদের প্রকাশ্যে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তার দাবি, মানুষ আর আওয়ামী লীগের সহযোগী শক্তিকে ভোট দিতে চায় না।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির নেতারা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। জেলা জাতীয় পার্টির সদস্যসচিব আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তারা মাঠে ভালো সাড়া পাচ্ছেন এবং জিএম কাদেরের বিকল্প নেই। মহানগর কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি লেবু মিয়া জানান, গণভোট ও জুলাই আন্দোলন ইস্যুতে ওঠা প্রশ্নগুলোর জবাব জিএম কাদের নিজেই দিচ্ছেন।
রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও প্রেসিডিয়াম সদস্য আজমল হোসেন লেবু বলেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং জিএম কাদের নিজে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তাদের প্রত্যাশা, এবারও লাঙ্গল প্রতীক বিজয়ী হবে।
এ বিষয়ে জিএম কাদের সাংবাদিকদের বলেন, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারেনি। সংবিধান অনুযায়ী সবার ভোটাধিকার রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি আতঙ্কিত নন এবং ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, কে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবে, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে যারা পরিবর্তন চায়, তাদের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকা স্বাভাবিক।
রংপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান জানান, এখন পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়নি। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।