ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর ও অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য গত কয়েক দিন ধরে অপসারণ করা হচ্ছে। তবে কার নির্দেশে, কোন সংস্থার উদ্যোগে এবং কী কারণে এই কাজ চলছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি জেলা প্রশাসন, পৌরসভা কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে দেখা যায়, ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে শ্রমিকরা চত্বর ও ভাস্কর্যের অংশ ভাঙার কাজ করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরেই অপসারণের কাজ চলছে। তবে কে বা কারা কাজটি করছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
শ্রমিকদের দাবি, ওই স্থানে প্রায়ই ছোটখাটো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটায় পৌরসভার উদ্যোগে এটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন। তবে ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রশাসক রথিন্দ্র নাথ রায় এ দাবি নাকচ করে বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে এ কাজ করা হচ্ছে না এবং কারা করছে সেটিও তাদের জানা নেই।
পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খান জানান, কেন ভাঙা হচ্ছে তা তার জানা নেই। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, এটি যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, তা তার জানা ছিল না, কারণ এটি অসম্পূর্ণ ছিল। জেলা প্রশাসন এ কাজ করছে না বলেও তিনি জানান। তার ভাষ্য, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং সম্ভবত সড়ক ও জনপথ বিভাগ ও পৌরসভা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।
তিনি আরও জানান, জেলা পুলিশ লাইনসের সামনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি নতুন প্রতিকৃতি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ভাস্কর্য ও চত্বরটি কারা অপসারণ করছে, তা তার জানা নেই।
জেলা পরিষদের প্রশাসক এম মাজিদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা দুই দফায় স্থাপনাটিতে ভাঙচুর চালিয়েছিল। পাশাপাশি এটি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও সৃষ্টি করছিল। বিভিন্ন সভায় এটি সরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তবে বর্তমানে কারা অপসারণ করছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহ নয়, সারা দেশের গর্ব। তার স্মৃতিচিহ্ন অপসারণ করা দুঃখজনক। একই স্থানে অথবা উপযুক্ত অন্য কোনো স্থানে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, পরিবারের কাউকে না জানিয়েই চত্বর অপসারণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজনের স্মৃতিচিহ্ন এভাবে সরিয়ে নেওয়া দুঃখজনক। দ্রুত নতুন করে পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ জানান, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা বিএনপির নেতা আব্দুল মজিদ বিশ্বাস বলেন, বর্তমান স্থাপনাটি তৎকালীন জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে নির্মাণ শুরু হলেও তা আর সম্পন্ন হয়নি। তবে যে কারণেই অপসারণ করা হোক, নতুন করে পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণ করা উচিত।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে মেয়র ও প্রশাসক পরিবর্তন হলেও কাজ আর এগোয়নি। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় চত্বরটি আগাছায় ঢেকে যায় এবং অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল।
উল্লেখ্য, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে শহীদ হন। অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ লাভ করেন।
কসমিক ডেস্ক