
ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থানের ধারাবাহিকতায় এবার বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে ইতালি সরকার। ১২ জুন থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন রি-ইমিগ্রেশন ডিক্রি দেশটির অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতালির অভ্যন্তরে এবং সমগ্র ইউরোপে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক।
নতুন ডিক্রির মূল লক্ষ্য হিসেবে ইতালি সরকার জানিয়েছে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা এবং আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমধ্যসাগর হয়ে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশ এবং আশ্রয় ব্যবস্থার চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ইতালিতে প্রবেশকারী বা যাদের কোনো বৈধ আইনি স্ট্যাটাস নেই, তাদের বিশেষ ডিটেনশন সেন্টার বা সীমান্ত ক্যাম্পে রাখা হতে পারে। এসব ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত আটক রাখা যাবে। এই সময়ের মধ্যে তাদের পরিচয় যাচাই, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ এবং আশ্রয় আবেদন মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হবে। আবেদন বাতিল হলে দ্রুত ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর হয়ে আসা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই নীতি আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপে অভিবাসন প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে এটি ইতালির অন্যতম কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শিশু ও পরিবারভিত্তিক অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসারে শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিবারগুলোকে আলাদা পরিবারভিত্তিক কেন্দ্রে রাখা হতে পারে। একা আসা অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পৃথক সুরক্ষা ব্যবস্থাও বজায় থাকবে, তবে তাদের বয়স যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হবে।
ডাবলিন রেগুলেশন অনুযায়ী, ইউরোপে প্রথম প্রবেশ করা দেশ সাধারণত আশ্রয় আবেদন পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। নতুন ডিক্রির আওতায় ইতালি এখন ডাবলিন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির পথে যাচ্ছে। ফলে কেউ যদি অন্য ইউরোপীয় দেশ হয়ে ইতালিতে প্রবেশ করে এবং তার প্রথম রেজিস্ট্রেশন অন্য দেশে হয়ে থাকে, তাহলে তাকে দ্রুত সেই দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এছাড়া “তৃতীয় নিরাপদ দেশ” নীতির গুরুত্বও বাড়ানো হয়েছে। যদি কোনো আশ্রয়প্রার্থী নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত একটি দেশ হয়ে ইতালিতে প্রবেশ করে, তাহলে ইতালি তার আবেদন গ্রহণ না করে সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করবে।
এই নীতি বাস্তবায়নে ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং আলবেনিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই কঠোর নীতির বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় আটক রাখা, দ্রুত ডিপোর্টেশন এবং সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ শরণার্থীদের মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন রি-ইমিগ্রেশন ডিক্রি শুধু ইতালির অভ্যন্তরীণ নীতিতেই নয়, বরং পুরো ইউরোপীয় অভিবাসন ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ইউরোপে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে যে কঠোর অবস্থান ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে, ইতালির এই পদক্ষেপ সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করছে।