
ইসলাম মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে শুধু সামাজিক বা পার্থিব স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান অর্জনের একটি হলো মহান আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করা। হাদিসের আলোকে জানা যায়, কিছু বিশেষ আমলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসার অধিকারী হতে পারে।
প্রসিদ্ধ তাবেঈ আবু ইদরিস খাওলানি (রহ.) বর্ণনা করেন, তিনি একদিন দামেস্কের একটি মসজিদে প্রবেশ করে এক সুদর্শন যুবককে দেখতে পান, যার চারপাশে অনেক মানুষ বসে ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে উপস্থিত লোকজন তাঁর কাছে সমাধান চাইতেন এবং তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। পরে তিনি জানতে পারেন, সেই ব্যক্তি ছিলেন মহান সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)।
পরদিন আবু ইদরিস (রহ.) আরও আগে মসজিদে এসে দেখেন, মুআজ (রা.) ইতোমধ্যে সেখানে উপস্থিত হয়ে নামাজ আদায় করছেন। নামাজ শেষে তিনি মুআজ (রা.)-এর কাছে গিয়ে সালাম দেন এবং বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।”
মুআজ (রা.) কয়েকবার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর চাদরের প্রান্ত ধরে কাছে টেনে বলেন, “সুসংবাদ গ্রহণ করো।” এরপর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস বর্ণনা করেন। সেই হাদিসে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, যারা তাঁর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, তাঁর জন্যই পরস্পরের সঙ্গে ওঠাবসা করে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎ করে, তাদের জন্য আল্লাহর ভালোবাসা অবধারিত হয়ে যায়। (মুসনাদে আহমাদ: ২২০৩০, সহিহ ইবনে হিব্বান: ২৫১০)
এই হাদিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, কোনো ব্যক্তিকে তার ঈমান, তাকওয়া ও নেক আমলের কারণে ভালোবাসা একটি ইবাদতস্বরূপ কাজ। দ্বিতীয়ত, কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে তা প্রকাশ করা সুন্নত। কারণ আবু ইদরিস (রহ.) সরাসরি মুআজ (রা.)-কে নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন।
তৃতীয়ত, জ্ঞানী ও নেককার মানুষের সান্নিধ্য লাভ করা এবং তাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা ইসলামে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মুআজ (রা.)-এর কাছে মানুষের ভিড় এবং তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হওয়া এ বিষয়টিরই প্রমাণ বহন করে।
এ ছাড়া হাদিসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি। ব্যক্তিগত স্বার্থ, অর্থনৈতিক লাভ কিংবা সামাজিক মর্যাদা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই হওয়া উচিত সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য।
আল্লাহর জন্য সাক্ষাৎ করা এবং পরস্পরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। যারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়, তাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ভালোবাসা নাজিল হয়।
সবশেষে, এই হাদিস আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রশংসা বা ভালোবাসার চেয়ে অনেক বড় অর্জন হলো আল্লাহর ভালোবাসা লাভ করা। একজন মুমিন যদি নিজের সম্পর্ক, আচরণ ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে স্থান দেয়, তবে সে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসার অধিকারী হতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিতে এর চেয়ে বড় সফলতা আর কিছু হতে পারে না।