
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও রাজস্ব ব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কর আদায় বৃদ্ধি, করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করা এবং একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে কর কাঠামো, ভ্যাট ব্যবস্থা এবং শুল্ক নীতিতে একাধিক সংস্কারমূলক উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি নারী করদাতা, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাস। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর করের হার কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখার আশা করা হচ্ছে।
তৃতীয় পরিবর্তন হিসেবে সোনা ও স্বর্ণালংকার খাতে কর ও ভ্যাট কমানোর ঘোষণা এসেছে। স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে এবং ভ্যাট ব্যবস্থাও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এতে স্বর্ণ ব্যবসায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
চতুর্থ পরিবর্তন প্রযুক্তি ও স্থানীয় শিল্পখাতকে ঘিরে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা আরও কয়েক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে দেশীয় শিল্প বিকাশে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো কর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখা। বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান কর্পোরেট কর হার বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে করের আওতা বাড়িয়ে করহার ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
ষষ্ঠ পরিবর্তন হিসেবে উৎসে কর্তিত করকে ‘ন্যূনতম কর’ না ধরে ‘অগ্রিম কর’ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত কর আটকে থাকার প্রবণতা কমবে এবং প্রয়োজন হলে কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সপ্তম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জন্য। কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ফ্রিল্যান্সার এবং স্টার্টআপ খাতে আরোপিত ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল কর্মীদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অষ্টম পরিবর্তন হলো আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নতুন ব্যবস্থা। এখন থেকে সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। নির্ধারিত সময়ের আগেই রিটার্ন দাখিল করলে করদাতারা বিশেষ কর ছাড় ও প্রণোদনাও পাবেন। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
এ ছাড়া মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার, শিশুখাদ্য প্রস্তুতিমূলক উপকরণে শুল্ক কমানো, কিছু মসলায় নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাতিল, ওষুধ শিল্পের কাঁচামালে শুল্ক ছাড় এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে কর সুবিধার মতো আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ প্রস্তাবিত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটের করসংক্রান্ত পরিবর্তনগুলোকে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর সংস্কারের পাশাপাশি করের আওতা সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের রাজস্ব কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হতে পারে।