
আগামী ১১ থেকে ১৭ মে পালিত হচ্ছে “বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ-২০২৬”। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমানোর কার্যকর উপায় তুলে ধরতেই এ বৈশ্বিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যাকশন অন সল্টের উদ্যোগে পালিত এ সপ্তাহের মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তি, পরিবার, স্বাস্থ্যকর্মী, খাদ্যশিল্প ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরা।
খাবার লবণের রাসায়নিক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। মানবদেহের জন্য এটি একটি অপরিহার্য উপাদান। শরীরের জলীয় ভারসাম্য রক্ষা, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা বজায় রাখা, পেশির সঠিক কাজ নিশ্চিত করা এবং রক্তের পিএইচ ভারসাম্য ধরে রাখতে লবণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি খাবারের স্বাদ বৃদ্ধিতেও এটি বহুল ব্যবহৃত।
তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর, কিডনি রোগ, ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, অস্টিওপোরোসিস ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া শরীরে পানি জমে ফোলাভাব, ভারী অনুভূতি, জয়েন্টের নমনীয়তা কমে যাওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার খেলে হৃদপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে। ২০২৩ সালের গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৭০ হাজার মৃত্যু সরাসরি অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের কারণে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে অসংক্রামক রোগ বর্তমানে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বছরে আনুমানিক ৫ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু অসংক্রামক রোগজনিত কারণে ঘটে। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই এসব রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে হৃদরোগ এককভাবে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশের জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে আক্রান্ত করছে এবং অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এর অন্যতম কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৫ গ্রামের কম লবণ গ্রহণের পরামর্শ দেয়, সেখানে বাংলাদেশে একজন মানুষ গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করছেন, যা সুপারিশকৃত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ।
বর্তমানে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে প্রক্রিয়াজাত ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যবহার বাড়ছে। রুটি, সস, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, চিজ, বেকারি পণ্য, ফাস্ট ফুড ও বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবারে উচ্চমাত্রার সোডিয়াম থাকে। ফলে অজান্তেই মানুষ প্রতিদিন অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করছেন।
এই স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রান্নায় ও খাবারের টেবিলে লবণ কম ব্যবহার, কম লবণযুক্ত খাবার নির্বাচন এবং প্রাকৃতিক ভেষজ ও মসলা ব্যবহার স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য সহায়ক হতে পারে। রসুন, আদা, গোলমরিচ, ধনিয়া, দারুচিনি, লেবু ও ভিনেগারের মতো উপাদান খাবারের স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি লবণের ব্যবহার কমাতে সহায়তা করে।
এছাড়া প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে সোডিয়ামের পরিমাণ কমাতে শিল্পখাতে নীতিমালা প্রণয়ন, প্যাকেটজাত খাবারে স্পষ্ট লেবেলিং ব্যবস্থা চালু, স্কুল ও কর্মস্থলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশ তৈরি এবং নিয়মিত জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ উপলক্ষে Bangladesh Food Safety Authority বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সংস্থাটি World Health Organization এবং BRAC JPG School of Public Health-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যে সোডিয়ামের নির্ধারিত সীমামাত্রা চূড়ান্ত করার কাজ করছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে বিভিন্ন সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমও আয়োজন করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্মিলিত সচেতনতা, সঠিক খাদ্য নির্বাচন এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতির মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ কমানো সম্ভব। আর এর মাধ্যমে হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমিয়ে সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা যেতে পারে।