
বাংলাদেশে শিশুশ্রম কমানোর নানা উদ্যোগ চললেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সর্বশেষ গবেষণা ও পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশুশ্রমের হার দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিভাগ-এ। একসময় যাকে বলা হতো শিক্ষানগরী, আজ সেখানে হাজারো শিশু স্কুলের বদলে গ্যারেজ, কৃষি খামার, ওয়ার্কশপ এবং ইটভাটায় কাজ করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে শিশুশ্রমের হার ১২.৪ শতাংশ, যা দেশের সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। জাতীয় গড় যেখানে ৯.২ শতাংশ, সেখানে রাজশাহীর এই হার পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
গবেষণা বলছে, রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমে যুক্ত। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী দেশে মোট শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৮০ হাজার, যার একটি বড় অংশ উত্তরাঞ্চলীয় এই বিভাগেই অবস্থান করছে।
সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক শিশু ১০–১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছে মোটর গ্যারেজ, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ ও ছোট কারখানায়। কেউ আবার কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে পরিবারের আয় নিশ্চিত করছে। এদের অনেকেরই বয়স ১০ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে, যারা স্বাভাবিকভাবে স্কুলে থাকার কথা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুশ্রম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্য, মৌসুমি কর্মসংস্থান সংকট, শিক্ষাঝরে পড়া এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব। অনেক পরিবার শিশুর কাজকে “সহায়তা” বা “দক্ষতা শেখা” হিসেবে দেখায়, ফলে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
রাজশাহীর কৃষিখাতেও শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষিশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে অধিকাংশই ছেলে শিশু, যারা পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
এছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাত যেমন—গ্যারেজ, টেইলারিং, ইটভাটা ও ছোট ব্যবসায় শিশুদের নিয়োগ সহজ হওয়ায় ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। এসব স্থানে শ্রম আইনের তদারকি দুর্বল থাকায় শিশুরা দীর্ঘসময় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শিশুশ্রম শুধু শিক্ষা থেকে বঞ্চিতই করছে না, বরং শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অনেক শিশু হতাশা, অপরাধ প্রবণতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশে জড়িয়ে পড়ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ। এর মধ্যে রয়েছে দরিদ্র পরিবারের জন্য উপবৃত্তি বৃদ্ধি, বিনামূল্যে শিক্ষা সামগ্রী, স্কুলে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশু নিয়োগে কঠোর অভিযান।
এছাড়া উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশুশ্রম মনিটরিং কমিটি গঠন এবং স্কুল ছাড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের ডাটাবেজ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—শিশুশ্রম প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তন।
আজকের এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়—রাজশাহীর এই শিশুরা কি কখনো ফিরে পাবে তাদের হারানো শৈশব, নাকি ভবিষ্যতেও তারা পরিসংখ্যানের শ্রমিক হিসেবেই থেকে যাবে?