
বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী Sundarbans শুধু একটি বন নয়, বরং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জীবিকা ও প্রাকৃতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও বনটি এখনও পুরোপুরি অপরাধমুক্ত হয়নি বলে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। তখন ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। তবে আট বছর পরও নতুন করে বনদস্যুদের তৎপরতা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং অভয়ারণ্যে শুঁটকি উৎপাদনের অভিযোগ আবারও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও এই সময়কে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বনভিত্তিক অপরাধ পরিচালনা করছে। বিশেষ করে মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে অনুপ্রবেশ করে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করা হচ্ছে। পরে বনের ভেতর অস্থায়ী ঘাঁটিতে মাছ শুকিয়ে বাইরে পাচার করা হচ্ছে।
বনজীবীদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ সময়কে কেন্দ্র করে কিছু প্রভাবশালী মহল ও অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই চক্র সক্রিয় রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন ও অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা সম্ভব বলে তারা দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে সুন্দরবনে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছোট জাহাঙ্গীর, বড় জাহাঙ্গীর, দুলাভাই, নানা ভাই, জোনাবসহ একাধিক গোষ্ঠী। এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, অপহরণ এবং মুক্তিপণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বনজীবীরা জানান, “টোকেন সিস্টেম” নামে একটি চাঁদা আদায়ের পদ্ধতি এখনও চালু আছে। এক বাহিনীর এলাকায় প্রবেশ করলে নির্দিষ্ট চাঁদা দিয়ে টোকেন নিতে হয়, কিন্তু অন্য বাহিনীর এলাকায় গেলে আবার নতুন করে চাঁদা দিতে হয়। এতে সাধারণ জেলে ও শ্রমিকরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী বা “মহাজন” এই অর্থ আদায়ের সঙ্গে যুক্ত। তারা চাঁদা সংগ্রহ ও মুক্তিপণ আদায়ের কাজ পরিচালনা করে।
স্থানীয়দের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই দস্যুদের পুনরুত্থান আরও তীব্র হয়েছে। পুনর্বাসন কার্যক্রম দুর্বল হওয়া, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকট অনেক সাবেক দস্যুকে আবার অপরাধে ফিরতে বাধ্য করছে।
অন্যদিকে কোস্টগার্ড ও বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনে যৌথ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। Bangladesh Coast Guard জানিয়েছে, চাপ বাড়ালে দস্যুরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ এখনো রয়েছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ ও বন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে কিছু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক প্রবেশ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনে দস্যুতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই শুধু অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।