
দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিতকরণের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শিথিল ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতিমালার কারণে ব্যাংকগুলো বড় পরিমাণ খেলাপি ঋণকে পুনরায় নিয়মিত করছে। এতে আপাতদৃষ্টিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে এলেও অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনঃতফসিলের এই প্রবণতার ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র আড়াল হচ্ছে। কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখালেও বাস্তবে অনেক ঋণই আদায়যোগ্য নয় বা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। তবে একই সময়ে ব্যাংকের মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম যেমন সুদ আয় ও নতুন ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিথিল পুনঃতফসিল নীতির কারণে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ কমেছে, ফলে কাগজে-কলমে মুনাফা বেড়েছে। শুধু তিন মাসের ব্যবধানে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ২২ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমে প্রায় ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ধরনের হ্রাস বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নতি নির্দেশ করে না বরং এটি হিসাবরক্ষণগত সমন্বয়ের ফল। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের পুনঃতফসিল নীতি টেকসই নয়। এতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা আড়াল হয় এবং ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে নৈতিক ঝুঁকি বা “মোরাল হ্যাজার্ড” তৈরি হয়।
মোরাল হ্যাজার্ডের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, ঋণ ফেরত না দিলেও পরে সহজ শর্তে আবার সুবিধা পাওয়া যাবে। এই মানসিকতা ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা নষ্ট করে এবং ভালো গ্রাহকদেরও ঋণ ফেরত দিতে নিরুৎসাহিত করে।
ব্যাংকারদের মতে, ১০ বছরের দীর্ঘ পুনঃতফসিল সুবিধা এবং দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি চাপ কমালেও দীর্ঘমেয়াদে এটি নগদ প্রবাহ সংকট তৈরি করবে। কারণ ব্যাংকগুলো ঋণের কিস্তি ও সুদ আদায় করতে পারবে না, অথচ আমানতের বিপরীতে সুদ পরিশোধ চালিয়ে যেতে হবে।
এদিকে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই হার নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার এবং ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা নতুন ঋণ বিতরণ কমিয়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, খেলাপি ঋণ কমার বর্তমান চিত্র স্বস্তিদায়ক মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে ব্যাংক খাতের গভীর কাঠামোগত ঝুঁকি, যা ভবিষ্যতে বড় আর্থিক সংকটে রূপ নিতে পারে।