
বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি আবেগ, উৎসব এবং সামাজিক সংযোগের বড় মাধ্যম। বিশ্বকাপ এলেই দেশের অলিগলি, বাড়ির ছাদ এবং চায়ের দোকানগুলো রঙিন হয়ে ওঠে বিভিন্ন দেশের পতাকায়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে মানুষের উচ্ছ্বাস, তর্ক-বিতর্ক এবং আনন্দ যেন অন্য মাত্রা পায়। এই ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এবার এক ব্যতিক্রমী সামাজিক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
‘গোল ফর গুড’ নামে এই নতুন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসকে কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ক্যাম্পেইন অনুযায়ী, আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল যতগুলো গোল করবে, ততগুলো স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদের জন্য নিরাপদ ও সহজলভ্য মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের অনেক স্কুলে এখনও মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় স্যানিটারি ন্যাপকিন সহজলভ্য নয়, পর্যাপ্ত গোপনীয়তা নিশ্চিত করা যায় না এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবও প্রকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক কুসংস্কার ও লজ্জাবোধ, যা কিশোরীদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। ফলে মাসিক চলাকালীন সময়ে অনেক ছাত্রী অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তায় ভোগে এবং অনেক ক্ষেত্রে স্কুলে উপস্থিত হতে পারে না।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি তিনজন কিশোরীর মধ্যে একজন মাসে অন্তত তিন দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে শুধুমাত্র মাসিকজনিত সমস্যার কারণে। এছাড়া, প্রতি ১০ জন কিশোরীর মধ্যে ৭ জন তাদের প্রথম মাসিক শুরু হওয়ার আগে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণা পায় না। এই বাস্তবতা কিশোরীদের শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘গোল ফর গুড’ ক্যাম্পেইনটি শুধু একটি সচেতনতামূলক উদ্যোগ নয়, বরং একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকেও ইঙ্গিত করে। প্রতিটি গোলের সঙ্গে যুক্ত থাকবে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা। ফুটবলপ্রেমীদের আনন্দকে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ক্যাম্পেইন কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। স্কুলগুলোতে ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের ফলে মেয়েরা সহজেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারবে, যা তাদের নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
ক্যাম্পেইনটি পুরো বিশ্বকাপজুড়ে চলবে। টুর্নামেন্ট শেষে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মোট গোলসংখ্যা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে কতটি স্কুলে এই সুবিধা দেওয়া হবে। স্কুল নির্বাচন করা হবে অংশগ্রহণকারীদের সুপারিশ, স্থানীয় প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে—মাসিক স্বাস্থ্য কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা সমাজের সকলের দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘গোল ফর গুড’ ক্যাম্পেইনটি ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তর করার একটি চমৎকার উদাহরণ। এটি শুধু কিশোরীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে না, বরং ভবিষ্যতে আরও এমন উদ্যোগের পথ প্রশস্ত করবে।