
বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদেও যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তার সবচেয়ে অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে তিনি জার্মান ফুটবল দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে তৈরি করে আসছেন বিশাল আকৃতির পতাকা। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তিনি তৈরি করেছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা, যা এখন পর্যন্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ও ব্যতিক্রমী সৃষ্টি।
মাগুরা সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকাটি প্রদর্শন করা হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন। পুরো এলাকাজুড়ে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
পেশায় কৃষক আমজাদ হোসেন (৭৪) বিশ্বকাপ এলেই জার্মানির পতাকা বানানোকে নিজের আবেগ ও ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে দেখেন। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রায় তিনি প্রতি বিশ্বকাপেই পতাকার দৈর্ঘ্য বাড়িয়েছেন। ২০১০ সালে আড়াই কিলোমিটার, ২০১৪ সালে সাড়ে তিন কিলোমিটার, ২০১৮ সালে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এবং এবার ২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষে রেকর্ড ৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরি করেছেন তিনি।
আমজাদের পতাকা তৈরির পেছনের গল্পও সমানভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি জানান, ২০০৪–০৫ সালের দিকে এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় অসুস্থ ছিলেন। বিভিন্ন চিকিৎসার পর এক হোমিওপ্যাথিক ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। সেই সময় থেকেই জার্মানির প্রতি তাঁর গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জন্ম নেয়। এরপর থেকেই তিনি জার্মান ফুটবল দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ সমর্থকে পরিণত হন।
তবে এই উদ্যোগ তার জন্য কখনোই সহজ ছিল না। পতাকা তৈরির খরচ জোগাতে গিয়ে তিনি একাধিকবার আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ২০১৪ সালে পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি নিজের ৩০ শতক জমি বিক্রি করে পতাকা তৈরির খরচ বহন করেন, যা সে বছর প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ছিল। সেই বছর জার্মানি বিশ্বকাপ জেতায় তিনি আনন্দে গ্রামে গরু জবাই করে মেজবান আয়োজনও করেন।
আমজাদের এই ব্যতিক্রমী ভালোবাসা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৪ সালে জার্মান রাষ্ট্রদূত নিজে মাগুরায় এসে তাঁর পতাকা উদ্বোধন করেন এবং জার্মান ফুটবল ফ্যান ক্লাবের আজীবন সদস্যপদ প্রদান করেন। পরবর্তী বিশ্বকাপগুলোতেও জার্মান দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাঁর আয়োজন পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেন, তিনি কখনো কারও কাছে সাহায্য চাননি। এবারের পতাকা তৈরির ব্যয় তার সন্তানেরা বহন করেছে। ভবিষ্যতে তিনি এই ৭.৫ কিলোমিটার পতাকা জার্মান দূতাবাসকে উপহার দিতে চান, যাতে এটি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা যায়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আমজাদ আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন। তিনি আশা করেন, সুস্থ থাকলে ২০৩০ বিশ্বকাপ উপলক্ষে তিনি ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরি করবেন এবং সেটি জার্মানির কোনো জাদুঘরে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য হস্তান্তর করবেন।
সব মিলিয়ে, মাগুরার এই কৃষক শুধু একজন সমর্থক নন—তিনি হয়ে উঠেছেন ভালোবাসা, আবেগ এবং বিশ্বকাপ ফুটবলের এক অনন্য প্রতীক। তার এই উদ্যোগ গ্রামীণ বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতি ও আবেগকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরছে।