
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিকে শেষ বিদায় জানাল তার স্বজন ও এলাকাবাসী। শনিবার (৯ মে) বাদ আসর জানাজা শেষে মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। পুরো গ্রামজুড়ে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।
শনিবার সকালে দুবাই হয়ে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে বৃষ্টির মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরে সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করে নিজ বাড়ি মাদারীপুরে নিয়ে যান। দুপুরের দিকে মরদেহ চর গোবিন্দপুর গ্রামে পৌঁছালে এলাকাবাসীর ভিড় জমে যায়। এক নজর দেখতে ছুটে আসেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষজন।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্যদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। অনেকেই বৃষ্টির এমন করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারছিলেন না। এলাকার প্রবীণদের কেউ কেউ বলেন, ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র ও স্বপ্নবাজ একজন মানুষ।
মেয়ের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন জানান, তার মেয়ের বড় স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে মানুষের জন্য কাজ করা। তিনি বলেন, বৃষ্টি গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও অর্থ সমাজের অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে চেয়েছিল। গ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কিছু করার পরিকল্পনাও ছিল তার।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিদেশে থেকেও বৃষ্টি সবসময় দেশের কথা ভাবতেন। পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং ভবিষ্যতে দেশে ফিরে শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে অবদান রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নিল না।
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তার গবেষণাকর্ম ও একাডেমিক অগ্রগতি নিয়ে শিক্ষক ও সহপাঠীদের মাঝেও ইতিবাচক মূল্যায়ন ছিল বলে জানা গেছে। তার অকাল মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মাঝেও শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
বৃষ্টি ও লিমনের মৃত্যুর পর ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ তাদের মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। বিষয়টি পরিবারকে কিছুটা হলেও মানসিক সান্ত্বনা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। তারা বলেন, বৃষ্টির অসমাপ্ত স্বপ্ন হয়তো আর পূরণ হবে না, কিন্তু তার মেধা ও অর্জন পরিবার এবং দেশের মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন। অনেকেই এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং পরিবারটির প্রতি সমবেদনা জানান।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, বৃষ্টির মৃত্যু দেশের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি বলেন, একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামের মেয়েদের মধ্যে বৃষ্টি ছিলেন অনুপ্রেরণার নাম। বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও তিনি নিজের শেকড় ভুলে যাননি। তার এই অকাল মৃত্যু শুধু পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্যই গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ বিদায়ের সময় অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু। স্বপ্নভরা এক তরুণীর জীবন এভাবে থেমে যাওয়ায় শোকাহত হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত বৃষ্টিকে ঘিরে এখন শুধু স্মৃতি, কান্না আর অপূর্ণ স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস।