
ইসলামে তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ হলো ঈমানের মূল ভিত্তি। একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর বান্দা ও রাসুল হিসেবে মেনে নেওয়া। এ বিষয়েই একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস বর্ণিত হয়েছে সাহাবি হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর প্রসঙ্গে।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন মুআজ (রা.) মহানবী (সা.)-এর সাওয়ারির পেছনে বসা ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বারবার সম্বোধন করে বললেন, “হে মুআজ!” প্রতিবারই মুআজ (রা.) বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দেন, “লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি উপস্থিত আছি।” মহানবী (সা.) তিনবার এভাবে সম্বোধন করার পর বলেন, “যে ব্যক্তি সত্য অন্তর দিয়ে সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল—আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।”
এই হাদিসে ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকিদা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শুধু মুখে কালিমা উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং তা অন্তরের গভীর বিশ্বাস ও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। মহানবী (সা.) “সত্য মনে সাক্ষ্য দেবে” বলে এ বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট করেছেন। অর্থাৎ ঈমান হতে হবে খাঁটি ও কপটতামুক্ত।
এই হাদিস থেকে প্রথম যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—তাওহিদই মুক্তির মূল চাবিকাঠি। একজন ব্যক্তি যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাত স্বীকার করে, তবে সেটিই তার নাজাতের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ঈমানের সঙ্গে আমলও জরুরি। হাদিসে দেখা যায়, মুআজ (রা.) যখন অন্যদের এ সুসংবাদ দেওয়ার কথা বলেন, তখন মহানবী (সা.) আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, মানুষ হয়তো শুধু এ কথার ওপর ভরসা করে আমলে অলস হয়ে পড়তে পারে। এ থেকে বোঝা যায়, জান্নাতের আশা যেমন রাখতে হবে, তেমনি নেক আমলের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।
হাদিসটি মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাদানের পদ্ধতির দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আগে তিনি তিনবার “হে মুআজ” বলে সম্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে মনোযোগ সৃষ্টি ও বিষয়ের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুনরাবৃত্তি করে বলাকে উত্তম মনে করা হয়।
এ হাদিসে সাহাবায়ে কেরামের আদব ও আনুগত্যেরও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। মুআজ (রা.) প্রতিবার অত্যন্ত সম্মান ও বিনয়ের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। এটি শিক্ষক, বড় ও দ্বিনি নেতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ইসলামী শিক্ষাকে তুলে ধরে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইলম বা দ্বিনি জ্ঞান গোপন না করা। মুআজ (রা.) জীবনের শেষ সময়ে এসে এ হাদিস বর্ণনা করেছিলেন, যেন জ্ঞান গোপন করার গুনাহে পতিত না হন। এতে বোঝা যায়, ইসলামে উপকারী জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব কত বেশি।
এই হাদিস একজন মুমিনকে আশা ও ভয়—দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে চলার শিক্ষা দেয়। একদিকে আল্লাহর রহমতের সুসংবাদ রয়েছে, অন্যদিকে আমলে অবহেলার ব্যাপারেও সতর্কতা রয়েছে।
অতএব, সত্যিকার ঈমান, তাওহিদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং নেক আমলের সমন্বয়ই একজন মুসলিমের মুক্তির পথ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খাঁটি ঈমান ও আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।