
রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোমা আক্তার (ছদ্মনাম) একদিন হঠাৎ দেখতে পান, তার ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুকে একটি ভুয়া আইডি খোলা হয়েছে। সেখানে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা অশ্লীল ছবি পোস্ট করা হচ্ছে এবং দেওয়া হচ্ছে আপত্তিকর ক্যাপশন। অল্প সময়ের মধ্যেই ছবিগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। পরে বাধ্য হয়ে সাইবার পুলিশের সহযোগিতা নেন।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তারই এক খালাতো ভাই এই কাজ করেছেন। একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন রাজধানীর শনিরআখড়ার বাসিন্দা বৃষ্টি খানম (ছদ্মনাম)। ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে আরিফ নামে এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। পরে দেখা করার সময় কৌশলে বৃষ্টির ফেসবুক আইডির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ওই যুবক। এরপর এআই প্রযুক্তি দিয়ে ভুয়া অশ্লীল ছবি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেইল শুরু করে। ভয়ভীতি দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় অর্থও।
শুধু সোমা বা বৃষ্টি নন, সারা দেশেই বাড়ছে সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল প্রতারণা। বিশেষ করে নারীরা বেশি টার্গেট হচ্ছেন। এআই জেনারেটেড ছবি ও ভিডিও এখন সাইবার অপরাধীদের বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। কখনো পারিবারিক বিরোধ, কখনো প্রেমের সম্পর্ক, আবার কখনো ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে মানুষকে সামাজিকভাবে হেয় করতে এসব প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের তথ্যমতে, গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে ৯০৫টি সাইবারসংক্রান্ত জিডি জমা পড়েছে। এর মধ্যে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ রয়েছে ১৩০টি। এছাড়া টেলিগ্রামভিত্তিক আর্থিক প্রতারণা ২৩৭টি, ফেসবুক প্রতারণা ১৫০টি, বিকাশ প্রতারণা ২২০টি এবং ফেসবুক ও জিমেইল হ্যাকের ৯৮টি অভিযোগ জমা হয়েছে।
ডিবি জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে ১৫টি ফেসবুক আইডি, ৭টি জিমেইল অ্যাকাউন্ট এবং দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে শত শত মানুষকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগের সংখ্যা বাড়লেও জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সাইবার অপরাধীরা এখন শুধু ফেসবুক হ্যাকেই সীমাবদ্ধ নেই। ফিশিং লিংক, ওটিপি প্রতারণা, ভুয়া বিনিয়োগ, অনলাইন শপিংয়ের ফাঁদ এবং এআই-নির্ভর কনটেন্ট ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণার শিকার করা হচ্ছে। একটি লিংকে ক্লিক করলেই মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে হ্যাকারদের হাতে।
ঢাকার আইনজীবী রুহুল আমিন হোয়াটসঅ্যাপে আসা একটি লিংকে ক্লিক করার পর তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়ে যায়। পরে ডিবির সাইবার ইউনিট দ্রুত তার আইডি উদ্ধার করে দেয়। একইভাবে সরকারি চাকরিজীবী তাসলিমা বেগমের হারানো মোবাইলের মাধ্যমে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টও ঝুঁকিতে পড়ে। পরে সাইবার পুলিশের সহায়তায় অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল দুটোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার সচেতনতাও বাড়ানো জরুরি। টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা এবং ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ বলেন, বর্তমানে সাইবার অপরাধ আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। তাই প্রযুক্তিগত সচেতনতা ছাড়া নিরাপদ থাকা কঠিন। তার মতে, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।