
দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন সাধারণ মানুষ। জ্বালানি তেল, গ্যাস, যাতায়াত ভাড়া থেকে শুরু করে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আয় না বাড়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে প্রতিনিয়ত হিসাব করে চলতে হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও পাড়ামহল্লার মুদি দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি কিছু কিনছেন না। সংসারের খরচ সামাল দিতে এখন অনেক পরিবার অল্প অল্প করে বাজার করছেন। কেউ সপ্তাহের বাজার একসঙ্গে করছেন না, আবার কেউ কম দামের বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
খিলক্ষেত এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক মো. আতিক ইসলাম জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ২২ হাজার টাকা বেতনে ঢাকায় সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, এখন প্রয়োজন ছাড়া কিছু কেনার সুযোগ নেই। পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে। মেয়ের ইলিশ মাছ খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সেটি কিনলে অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কমাতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, সয়াবিন তেলের দাম আবারও বেড়েছে। এক লিটার তেলের বোতল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৯৫০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, আগের মতো বড় বোতলের তেল কম বিক্রি হচ্ছে। অনেকেই এখন ছোট বোতল কিনছেন, যাতে একসঙ্গে বেশি টাকা খরচ করতে না হয়। পাম তেলের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় সেটির চাহিদাও বেড়েছে।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কম দামে নিত্যপণ্য পাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা হয়ে উঠেছে টিসিবির পণ্য। ক্রেতারা বলছেন, বাজারের তুলনায় কম দামে পণ্য কিনতে পারায় কিছুটা স্বস্তি মিলছে।
শুধু তেল নয়, সবজির বাজারেও বেড়েছে দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পটোল, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙ্গা, করলা, বরবটি—সবকিছুর দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কাঁচামরিচের দামও কেজিতে ১০০ টাকার আশপাশে ঘোরাফেরা করছে।
মাছ, মাংস ও ডিমের বাজারেও একই চিত্র। ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৮০০ টাকার ওপরে এবং খাসির মাংস ১১০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ডিমের দামও বেড়ে ডজনপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের কারণে পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। অন্যদিকে তীব্র গরমে খামারে মুরগি মারা যাওয়ায় ডিমের জোগান কমেছে বলেও দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনৈতিক গবেষক ড. মো. আবু ইউসুফ বলেছেন, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকলে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি মনে করেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি জোরদার করা এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার তদারকি বাড়ানো জরুরি।
এদিকে অনেক সুপার শপ ও মুদি দোকানে বড় প্যাকেটের বদলে ছোট বা মিনি প্যাকেটের পণ্যের বিক্রি বেড়েছে। ক্রেতারা বলছেন, একসঙ্গে বেশি টাকা খরচ করতে না পারায় ছোট প্যাকেট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।