
ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করা মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদ অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের জৈবিক পিতা তার আপন বড় ভাই। প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় ওই ইমামকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরী ২০১৯ সালে স্থানীয় একটি মক্তবে পড়াশোনা শেষ করে। কয়েক বছর পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান জন্ম দিলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই মক্তবের শিক্ষক এবং স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর মা বাদী হয়ে পরশুরাম মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ অস্বীকার করে মোজাফফর আহমদ পাল্টা মামলা করতে আদালতে গেলে সেখান থেকেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি এক মাস দুইদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান।
তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ কিশোরী ও অভিযুক্ত ইমামের নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকার সিআইডি ল্যাবে পাঠায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিশোরীর নমুনায় পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ফলে মোজাফফরের ডিএনএর সঙ্গে কোনো মিল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে পুলিশ নতুন করে তদন্ত শুরু করে এবং কিশোরী ও তার নবজাতকের জৈবিক পিতা শনাক্তে আবারও ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করে। তদন্ত চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী একপর্যায়ে স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করে আসছিল। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি গোপন রাখতে স্থানীয় ইমামকে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করেন বলেও জানা যায়।
এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে অভিযুক্ত বড় ভাইকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি আপন বোনকে ধর্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে আদালতের নির্দেশে কিশোরী, নবজাতক এবং অভিযুক্ত ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পুনরায় ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
ডিএনএ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, অভিযুক্ত বড় ভাইয়ের সঙ্গে শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, কারাভোগ করা ইমাম মোজাফফর আহমদ ওই শিশুর জৈবিক পিতা নন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কিশোরীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
ঘটনার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মোজাফফর আহমদ বলেন, সম্পূর্ণ নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও তাকে কারাভোগ করতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এ ঘটনায় তিনি সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছেন এবং মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরিও হারিয়েছেন। মামলার খরচ চালাতে জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, বৈজ্ঞানিক তদন্ত ছাড়া অনেক সময় প্রকৃত সত্য সামনে আসে না। ডিএনএ পরীক্ষার কারণেই প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হয়েছে এবং একজন নির্দোষ ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছেন। তিনি এ ঘটনাকে সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বলেও মন্তব্য করেন।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশ্রাফুল ইসলাম জানান, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, তথ্যপ্রমাণ ও ডিএনএ বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত সত্য উদঘাটনের পর নির্দোষ ব্যক্তির নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।