প্রিন্ট এর তারিখঃ May 10, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ May 7, 2026 ইং
ওষুধ পেতে দেরি: রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দায়ে ঝুঁকিতে জীবন, অভিযোগ প্রভাবশালী চক্রের ছায়া

চট্টগ্রামের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এখন শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়—অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রতার প্রতীক হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের। যেখানে জীবনের লড়াই হওয়ার কথা চিকিৎসা কক্ষে, সেখানে সেই লড়াই এখন শুরু হচ্ছে ওষুধের লাইনে।
হাসপাতালজুড়ে হাজারো রোগীর ভিড়, অথচ ন্যায্যমূল্যের ফার্মেসি মাত্র একটি। ফলে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে অন্তহীন লাইন, ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা—যেখানে প্রতিটি মিনিটই কারও জীবনের সমান মূল্যবান। স্ট্রোক, দুর্ঘটনা বা সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে এই বিলম্ব যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা প্রতিদিনই অনুভব করছেন স্বজনরা।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই দেখছেন সুস্পষ্ট প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে। প্রশ্ন উঠছে—একটি অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল হয়েও কেন প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা সম্প্রসারণ করা হয়নি? কেন এখনো জরুরি বিভাগ, প্রধান ফটক বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত ফার্মেসি স্থাপন করা হলো না? দীর্ঘদিনের এই সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থাকা কি কেবল অবহেলা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো অদৃশ্য প্রভাব—এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
রোগীর স্বজনদের একটি অংশ অভিযোগ করছেন, হাসপাতালকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয়, যারা ওষুধ সরবরাহ ও বেচাকেনার ওপর অপ্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। তাদের দাবি, ভেতরের কিছু সামগ্রী বাইরে পাচার হয়ে পুনরায় বিক্রির মতো অনিয়মও ঘটছে। যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সামনে আসেনি, তবুও সংশ্লিষ্টদের নীরবতা ও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগের অভাব এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছে।
এদিকে ফার্মেসির কিছু কর্মচারীর আচরণ নিয়েও ক্ষোভ বাড়ছে। রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অযৌক্তিক বিলম্ব, এমনকি সামান্য চাহিদা—যেমন আলাদা প্যাকেট—নিয়েও অপমানজনক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ঘটনার বর্ণনায় উঠে এসেছে, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে অনেককে।
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল এখনও চট্টগ্রামের লাখো মানুষের শেষ ভরসা। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও সেবার মান ও ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাতের অগ্রাধিকার নিয়েও। নতুন অবকাঠামো, জনবল ও সেবা বাড়ানোর পরিবর্তে সমস্যাগুলো বছরের পর বছর জমতে থাকায় আজকের এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, এটি শুধু একটি হাসপাতালের সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও তদারকির ঘাটতির প্রতিফলন। তারা বলছেন, “যেখানে চিকিৎসা পাওয়াটা মৌলিক অধিকার, সেখানে ওষুধ পেতে যুদ্ধ করতে হওয়া এক ধরনের নীরব নিষ্ঠুরতা।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একাধিক ন্যায্যমূল্যের ফার্মেসি স্থাপন, সেবার বিকেন্দ্রীকরণ, এবং অভিযোগ ওঠা অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। অন্যথায়, অব্যবস্থাপনার এই চক্র ভেঙে না পড়লে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই—নিজের জীবন দিয়ে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দ্যা ডেইলি কসমিক পোষ্ট । বাংলা