
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি এখন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি খাতে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। তবে এর ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তাও দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক ও চিন্তিত হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একাধিক জরিপে উঠে এসেছে যে, মানুষ এখন এআই প্রযুক্তিকে শুধুমাত্র সুবিধার উৎস হিসেবে নয়, বরং চাকরি, নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবেও দেখছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান Stanford University প্রকাশিত “২০২৬ এআই ইনডেক্স রিপোর্ট”-এ বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মনে করেন, এআই-নির্ভর পণ্য ও সেবার বিস্তার তাদের মধ্যে অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি করছে।
এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত কয়েক বছরে এআই প্রযুক্তি নিয়ে যে ইতিবাচক উত্তেজনা ছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান হারানোর ভয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির অতিরিক্ত প্রভাব নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক অংশগ্রহণকারী মনে করছেন, এআই ভবিষ্যতে চাকরির বাজারকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে, যেখানে কিছু পেশা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
এআই নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ChatGPT চালুর পর থেকে এআই-সম্পর্কিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও ঝুঁকির হার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকদের মতে, এআই সিস্টেমকে নিরাপদ করার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক সময় এর কার্যকারিতা বা নির্ভুলতা কিছুটা কমে যেতে পারে—যা প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, মার্কিন পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান Gallup পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এআই নিয়ে আগ্রহ কমছে এবং উদ্বেগ বাড়ছে। জেনারেশন জি বা তরুণদের মধ্যে এআই নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব কমে এসেছে, আর একই সঙ্গে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এআই নিয়ে জনমতের এই পরিবর্তনকে বিশেষজ্ঞরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংকেত হিসেবে দেখছেন। আচরণবিষয়ক বিশ্লেষক ক্যারোলিন অর বুয়েনো মনে করেন, প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে মেলে না। তার মতে, মানুষ এখন মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়, চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত।
এছাড়া এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে। কিছু অনলাইন আন্দোলন ও গ্রুপ এআই উন্নয়ন সীমিত বা স্থগিত করার দাবি তুলছে। যদিও এসব মতামত সর্বজনীন নয়, তবে এটি প্রযুক্তি নিয়ে সমাজে বাড়তে থাকা বিভক্তির ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, প্রযুক্তি খাতে অগ্রণী প্রতিষ্ঠান OpenAI-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা Sam Altman-কে ঘিরেও সম্প্রতি কিছু নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ ও ঘটনার খবর বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব ঘটনা নিয়ে এখনো বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও তথ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এআই প্রযুক্তি যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, ততই এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে কতটা সহজ করবে, নাকি নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়।