
কয়েক দশকের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছিল ভারেস শহরের মানুষ। রূপা ও সীসার খনি চালুর পর কর্মসংস্থান ও ব্যবসার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছিল এলাকাটিতে। তবে সেই আশার জায়গায় এখন নেমে এসেছে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি পরিচালিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় খনির আশপাশে বসবাসকারী শত শত মানুষের রক্তে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত সীসা পাওয়া গেছে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের শরীরে সীসার উপস্থিতি মিলায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০০ জনেরও বেশি বাসিন্দার রক্তে সীসার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। খনির প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী অন্তত ১৭ জনের শরীরে সীসার মাত্রা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সীসার সংস্পর্শে থাকলে মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
এই ঘটনার পর বুধবার (৬ মে) বসনিয়ার চারটি পরিবেশবাদী সংগঠন কানাডাভিত্তিক খনি প্রতিষ্ঠান Dundee Precious Metals–এর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, খনি কার্যক্রম পরিচালনার সময় স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়েছে।
পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ নজরদারি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল। তাদের মতে, খনি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলার ফলেই সাধারণ মানুষ বিষাক্ত দূষণের শিকার হচ্ছেন।
অভিযুক্ত কোম্পানিটি ঘটনার বিষয়টি স্বীকার করলেও সরাসরি দায় নিতে রাজি হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ইতোমধ্যে রক্ত পরীক্ষার খরচ বহন করেছে। পাশাপাশি মাটি ও পানির গুণগত মান পরীক্ষার কাজও শুরু করা হয়েছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, এলাকাটিতে অতীতেও খনি কার্যক্রম ছিল। ফলে বর্তমানে যে সীসা দূষণ দেখা যাচ্ছে, তা নতুন খনির কারণে নাকি পুরনো খনির প্রভাব— সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে খনির আশপাশে বসবাসকারী পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কৃষিকাজ ও গবাদিপশুর ওপর নির্ভরশীল অনেক পরিবার এখন এলাকা ছাড়ার কথা ভাবছেন। কারণ স্থানীয় শাকসবজি ও ফসলি জমিতেও সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক ভুক্তভোগী মা বলেন, “সীসা নিয়ে জীবন কাটানো সহজ নয়। আমরা জানি না আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ কী হবে।”
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা সরকারের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশটির ফেডারেল সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নেরমিন নিকশিচ বলেছেন, কোনো বড় বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে দেওয়া হবে না। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আদালত অভিযোগ গ্রহণ করলে খনিটির কার্যক্রম ও পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে এমন সংকট আরও বাড়তে পারে। ভারেসের ঘটনাকে তাই শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক খনি শিল্পের জন্যও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।