
দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইন যৌথভাবে বড় পরিসরের সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছে। বুধবার অনুষ্ঠিত এই মহড়ায় জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী একটি টাইপ ৮৮ জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা ফিলিপাইন নৌবাহিনীর একটি অবসরপ্রাপ্ত জাহাজে আঘাত হানে।
এই মহড়া এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন করে জোরদার হচ্ছে। ফিলিপাইন ও জাপান ইতিমধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আদান-প্রদান নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যা জাপানের সামরিক রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর সম্ভব হয়েছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি জানান, ভবিষ্যতে ফিলিপাইনকে আবুকুমা শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার এবং টিসি-৯০ প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এই উদ্যোগ দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মহড়াটি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষাসচিব গিলবার্তো তেওদোরো এবং জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র রাজধানী ম্যানিলা থেকে লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে পুরো মহড়া পর্যবেক্ষণ করেন।
ফিলিপাইন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, টাইপ ৮৮ ক্ষেপণাস্ত্র দুটি একসঙ্গে নিক্ষেপ করা হয় এবং মাত্র ছয় মিনিটের মধ্যে লক্ষ্যবস্তু জাহাজে আঘাত হানে। মহড়াটি উত্তর ফিলিপাইনের পাওয়ে উপকূল থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ চীন সাগরের মুখোমুখি এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়।
এই মহড়া ‘বালিকাতান’ নামে পরিচিত বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়ার অংশ, যার অর্থ ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের যৌথ উদ্যোগে শুরু হলেও এবার প্রথমবারের মতো জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স এবং নিউজিল্যান্ড সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে।
মহড়ায় ১৭ হাজারের বেশি সেনা অংশগ্রহণ করে, যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার যুক্তরাষ্ট্রের এবং ১ হাজার ৪০০ জাপানের সেনা ছিল। এই বিশাল অংশগ্রহণ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পশ্চিমা জোটের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, টাইপ ৮৮ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মূলত উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও সমুদ্রপথে হুমকি মোকাবিলার জন্য তৈরি। এই মহড়ার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এর বাস্তব সক্ষমতা প্রদর্শন করা হলো।
প্রতিরক্ষাসচিব তেওদোরো বলেন, এই সফল মহড়া ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ভবিষ্যতে আরও দেশ এই যৌথ উদ্যোগে যুক্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, এই অঞ্চলে চীনের অবস্থান নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ চীন সাগরের বড় অংশ নিজেদের বলে দাবি করে আসছে এবং এই ধরনের যৌথ সামরিক মহড়াকে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইন তাইওয়ানের কাছাকাছি বাতানেস প্রদেশে জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, যা চীনের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। চীন এ ধরনের পদক্ষেপকে প্ররোচনামূলক বলে সমালোচনা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এই ধরনের যৌথ মহড়া দিন দিন বাড়ছে। এতে একদিকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ চীন সাগরের এই সামরিক মহড়া শুধু প্রশিক্ষণ নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তি প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে।