
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার মাত্র ২.৩ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ। এই বড় ব্যবধান দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত Institute for Energy Economics and Financial Analysis (আইইইএফএ)-এর ‘Fostering Bangladesh’s Energy Transition’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, গত চার বছরে দেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা বাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
এই প্রবণতার ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের দামের ওঠানামার ওপর দেশের নির্ভরতা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তেল, কয়লা ও এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং আমদানিকৃত জ্বালানির উচ্চমূল্য বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বাড়ানোর বড় কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যয়বহুল পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট, কম ব্যবহার হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং গ্যাস সরবরাহ সংকট। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে।
বিশেষ করে ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে কয়লার দাম প্রায় ২৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ খাত বড় ধাক্কা খেয়েছে। যদিও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা দাম কমেছে, তবুও উৎপাদন ব্যয় আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন বাংলাদেশকে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর ফলে ভর্তুকির চাপও বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাড়ানোকে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানি কমানো সম্ভব। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মাত্র ১০০ মেগাওয়াট ছাদ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলেও দীর্ঘমেয়াদে ফার্নেস অয়েল আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে।
তবে এই খাতে কিছু নীতিগত বাধাও রয়েছে। যেমন—সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এসব নীতি সহজ করা গেলে খাতটি দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে প্রতিবেদনে। BBIN কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো গেলে ২০৩০ সালের পর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
করপোরেট খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। ওপেন অ্যাক্সেস ব্যয় কমানো হলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে এবং তাদের পরিবেশগত লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ এবং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ কমবে, পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তাও জোরদার হবে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি খাত আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।