
দেশে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন সরাসরি কৃষি খাতে পড়ছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে বিপাকে পড়েছেন ঠাকুরগাঁও জেলার কৃষকরা। এই পরিস্থিতিতে তারা ধীরে ধীরে ঝুঁকছেন বিকল্প শক্তির দিকে, যেখানে সৌর সেচ পাম্প হয়ে উঠছে একটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী সমাধান।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এখন নতুন এক পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। যেখানে একসময় ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেখানে এখন সৌর প্যানেলের মাধ্যমে চলছে সেচ কার্যক্রম। কৃষকদের কাছে এটি শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং টেকসই কৃষির এক নতুন পথ।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় ৬২ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে ২৯১টি সৌর সেচ পাম্পের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ৩৫ হাজার কৃষক।
এই সৌর সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে এক মৌসুমে সাশ্রয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ লিটার ডিজেল ও বিদ্যুৎ, যার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয় নয়, এই প্রযুক্তি পরিবেশ দূষণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কৃষকদের মতে, ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থায় যেখানে এক বিঘা জমিতে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে সৌর পাম্পে সেই খরচ নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। এতে কৃষকদের লাভ যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে পরিশ্রম ও সময়ের অপচয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের মোলানী গ্রামের মো. সলেমান আলী এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সৌর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন এবং ২০১৪ সালে ব্যাটারি ছাড়া সৌর সেচ পাম্প উদ্ভাবন করেন। বর্তমানে তার তৈরি ২৬টি সৌর পাম্প দিয়ে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে এবং প্রায় ৫০০ কৃষক এই সেবার সুবিধা নিচ্ছেন।
সলেমান আলীর উদ্যোগে কৃষকরা অর্ধেক মূল্যে সেচ সুবিধা পাচ্ছেন, যা স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে।
অন্যদিকে কৃষকরা জানিয়েছেন, আগে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সময়মতো সেচ দেওয়া কঠিন ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় জ্বালানি পাওয়া যেত না। এখন সৌর পাম্প সেই সমস্যা অনেকটাই দূর করেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের ভেলাজান এলাকার কৃষক আব্দুস সোবহান জানান, তিনি এবার ৩ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। আগে বিদ্যুৎ নির্ভর পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হতো, কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে সমস্যা হতো। এখন সৌর সেচ ব্যবস্থার কারণে খরচ ও ভোগান্তি দুই-ই কমেছে।
একইভাবে সাদেকুল ইসলাম ও জাহিদ মিলুর মতো কৃষকরাও জানান, সৌর সেচ ব্যবস্থার কারণে তাদের উৎপাদন খরচ কমেছে এবং ফসল উৎপাদনও ভালো হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকরাও এই প্রযুক্তি দেখতে ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন। তারা মনে করছেন, যদি এই ব্যবস্থা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কৃষিতে ব্যয় কমবে এবং জ্বালানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সৌর সেচ পাম্প কৃষকদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এটি শুধু খরচ কমাচ্ছে না, বরং টেকসই কৃষির দিকে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার কৃষিতে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সৌর সেচ পাম্প সেই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।