
টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে এবার ব্যাপক ফসলহানি দেখা দিয়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকায় সহস্রাধিক হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের চরম ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
গত কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে হাওড়ের নিম্নাঞ্চলগুলো দ্রুত পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে। অনেক স্থানে ধানক্ষেত সম্পূর্ণভাবে পানির নিচে চলে যায়, ফলে কৃষকরা সময়মতো ফসল কাটতে পারেননি। বাধ্য হয়ে অনেকেই পানির মধ্যেই ধান কাটার চেষ্টা করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এবারের মৌসুমে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, শ্রমিক সংকট এবং ধানের কম বাজারমূল্যও কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কৃষক পরিবার ও আত্মীয়দের সহায়তায় দ্রুত ধান কাটার চেষ্টা করলেও সব ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হয়নি।
সোমবার পর্যন্ত হাওড় এলাকায় প্রায় ৭৮ দশমিক ৫২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এর মধ্যেই বড় অংশের ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ বছর নেত্রকোনা জেলায় মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৮০১ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। হাওড় অঞ্চলে কাটা হয়েছে ২৯ হাজার ৩৭১ হেক্টর।
তবে বৃষ্টির কারণে হাওড় এবং নন-হাওড় উভয় এলাকায়ই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমির ধান তলিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত জেলার মোট ১৮ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ রাকিবুল হাসান জানান, শুধুমাত্র হাওড়ের ছয়টি উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার ৪২৭ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৪৮ হাজার ২৭১ মেট্রিক টন ধানের ক্ষতি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
তিনি আরও জানান, এই ক্ষতির ফলে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু হাওড়াঞ্চলেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার।
স্থানীয় কৃষক একদিল মিয়া জানান, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় হাওড়ে দ্রুত জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেতেই ধান সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “শ্রমিক পাওয়া যায় না, সময়ও কম ছিল। এখন যা কিছু কাটা যাচ্ছে, তা ভিজে যাচ্ছে, দামও কম পাচ্ছি।”
কৃষকরা জানান, এবারের মৌসুমে তারা একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে বাজারে ধানের কম দাম—দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন।
সোমবার বৃষ্টির পর রোদ ওঠায় কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে কৃষকদের মধ্যে। তারা দ্রুত মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যাতে যতটুকু ফসল বাঁচানো যায় তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হাওড় অঞ্চলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে নেত্রকোনার হাওড়ে এবারের বোরো মৌসুম কৃষকদের জন্য এক বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে, যা তাদের জীবিকা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।