
ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার বিলনালিয়া এলাকায় ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ঘটনার পর পুরো দেশজুড়ে শোক ও আলোড়ন তৈরি হয়েছে। গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৩)। এই নির্মম ঘটনার সবচেয়ে করুণ দিক হলো, মাত্র দুই বছরের শিশু মুসলিমা ইসলাম এখন পুরোপুরি এতিম হয়ে পড়েছে।
ঘটনার সময়টি ছিল গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, একটি ট্রাক দুর্ঘটনার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ দাবি করে ট্রাকটি পথচারীদের ধাক্কা দিয়েছে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই তথ্য দ্রুতই বিকৃত হয়ে ভয়াবহ গুজবে রূপ নেয়—যেখানে বলা হয়, অনেক মানুষ নিহত হয়েছে।
এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কিছু মানুষ রাস্তা অবরোধ করে ট্রাকটি আটক করে এবং চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে আনে। এরপর শুরু হয় নির্মম মারধর। ইট, লাঠি এবং লাথির আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনায় ট্রাকের দুই সহকারী নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হন এবং বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।
এই ঘটনার খবর প্রথমে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ছোট্ট মুসলিমার কান্নার ছবি এবং তার করুণ বাস্তবতা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। খুব দ্রুতই বিষয়টি নীতিনির্ধারক পর্যায়েও পৌঁছে যায়।
পরদিন নিহত হান্নান শেখের মরদেহ গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্না, প্রতিবেশীদের ভিড় এবং নিস্তব্ধ পরিবেশে সবচেয়ে অসহায় দৃশ্য ছিল ছোট্ট মুসলিমা। সে এখনো বোঝার বয়সে পৌঁছায়নি যে তার বাবা আর নেই। কখনো দাদীর কোলে, কখনো অন্যের কোলে চুপচাপ বসে থাকে সে। ফিডার মুখে নিয়েও তার চোখে অশ্রু থামছে না।
তার দাদী নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শিশুটির মা জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় তাকে ছেড়ে চলে যান। এখন বাবাও নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই এতিম শিশুর ভবিষ্যৎ কোথায়?
দাদা শাহিদ শেখ বলেন, তার ছেলে ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। যদি কোনো অপরাধও করতো, তবে আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত ছিল, এভাবে গণপিটুনিতে প্রাণ নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘটনাটি নজরে আসার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসলিমার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নেন। তিনি জানান, সরকারের নির্দেশনায় শিশুটির দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে এবং তাকে সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
এ সময় শিশুটির জন্য খাদ্যসামগ্রী, খেলনা এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও শিশুটির পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং গুজব ও গণপিটুনির ভয়াবহ সামাজিক বাস্তবতার একটি করুণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ভুল তথ্য কীভাবে একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে এবং একটি শিশুকে চিরতরে এতিম করে দিতে পারে—ফরিদপুরের এই ঘটনা তারই নির্মম প্রমাণ।