
বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রকে সাধারণত স্থায়ী বলে মনে করা হলেও ইতিহাস বলছে বাস্তবে এটি সবসময় পরিবর্তনশীল। রোমান সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা যুগোস্লাভিয়ার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রও সময়ের সঙ্গে ভেঙে গেছে। বর্তমান বিশ্বেও জলবায়ু পরিবর্তন, জাতিগত দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে কিছু দেশ তাদের বর্তমান রূপে টিকে নাও থাকতে পারে। কোথাও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, কোথাও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, আবার কোথাও দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে তুলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মালদ্বীপ ও টুভালু। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এসব দ্বীপরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে কিরিবাতিও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ও পানযোগ্য পানির সংকটে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। এসব দেশ ভবিষ্যতে নাগরিক পুনর্বাসনের মতো পরিকল্পনাও গ্রহণ করছে।
ইউরোপে বেলজিয়াম ও স্পেনের মতো দেশগুলো অভ্যন্তরীণ ভাষাগত ও আঞ্চলিক বিভাজনের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বেলজিয়ামে ফ্ল্যান্ডার্স ও ওয়ালোনিয়া অঞ্চল এবং স্পেনে কাতালোনিয়া ও বাস্ক অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব আন্দোলন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইয়েমেন ও ইরাক দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত ও বিভাজনের মধ্যে রয়েছে। ইয়েমেন কার্যত বিভিন্ন অংশে বিভক্ত হয়ে গেছে, আর ইরাকে কুর্দিস্তান অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করছে।
আফ্রিকায় সোমালিয়া ও লিবিয়ার পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল এবং সোমালিল্যান্ড কার্যত আলাদা প্রশাসন হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। লিবিয়াও গাদ্দাফির পতনের পর থেকে দুইটি প্রশাসনে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
এশিয়ায় উত্তর কোরিয়া একটি বিশেষ উদাহরণ। অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য পুনরেকত্রীকরণ বা শাসন পরিবর্তন—উভয় পরিস্থিতিই রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তন করতে পারে।
এছাড়া যুক্তরাজ্যেও স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা রয়েছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা এসব দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
হাইতিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাং সহিংসতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটির রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে। সাইপ্রাসও দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে, যেখানে পুনরেকত্রীকরণ এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র কখনোই স্থির থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তন, জাতিগত পরিচয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েন ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশের কাঠামো বদলে দিতে পারে। কিছু দেশ হয়তো বিলুপ্ত হবে, কিছু নতুনভাবে গঠিত হবে, আবার কিছু দেশ বর্তমান রূপেই টিকে থাকবে।